
নিজস্ব প্রতিবেদক, নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) | ১০ এপ্রিল, ২০২৬:
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে অবস্থিত ‘আহমেদ প্রাইভেট হাসপাতাল’-এ ভুল চিকিৎসায় প্রসূতি রাকিবা আক্তার (২০) মৃত্যুর ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছে স্থানীয় জনপদ। ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের পরিবর্তে ১১ লাখ টাকার বিনিময়ে একটি বিতর্কিত ‘শালিসি সমাধানের’ খবর পাওয়া গেছে। তবে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্ত চলাকালীনই হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় চালু করা নিয়ে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
গত ৪ এপ্রিল মধ্যরাতে প্রসব বেদনা নিয়ে রাকিবা আক্তারকে ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ডা. সৈয়দ কামরুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে সিজারিয়ান অপারেশন সম্পন্ন হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তার অবস্থার অবনতি ঘটে। পরিবারের অভিযোগ, অপারেশন চলাকালীনই রাকিবার মৃত্যু হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা গোপন করে তড়িঘড়ি করে তাকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের নাটক সাজায়। রাকিবার মা রেহেনা আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, “গাড়িতে তোলার সময় দেখি মেয়ের শ্বাস নেই, তখনই বুঝেছি ওরা আমার মেয়েকে মেরে ফেলেছে।”
১১ লাখ টাকার ‘শালিসি’ সমাধান
আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে গত কয়েকদিনে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের উপস্থিতিতে একটি শালিসি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভার সভাপতি মো. খবির উদ্দিন মাস্টার জানান:
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে ১১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এর মধ্যে ৮ লাখ টাকা নবজাতক শিশুর নামে ফিক্সড ডিপোজিট করা হবে।
বাকি ৩ লাখ টাকা প্রসূতির বাবা ও স্বামীর পরিবারের মধ্যে সমানভাগে ভাগ করে দেওয়া হবে।
তবে নিহতের স্বামী পক্ষ এই অর্থ নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে। রাকিবার বাবা শফিকুল ইসলাম অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, “আমরা গরিব, হাসপাতালের মালিকদের সাথে লড়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। আল্লাহই এর বিচার করবেন।”
তদন্তের মাঝেই হাসপাতাল চালু: জনমনে প্রশ্ন
বুধবার (৯ এপ্রিল) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে গঠিত তদন্ত কমিটি যখন হাসপাতালে তথ্য সংগ্রহ করছে, ঠিক তখনই হাসপাতালের অন্য পাশ দিয়ে রোগী ভর্তি ও স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছে।
তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন আসার আগেই কীভাবে একটি বিতর্কিত হাসপাতাল চালু হলো, তা নিয়ে স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সচেতন মহলের মতে, এভাবে টাকার বিনিময়ে মৃত্যুর দায় মুক্তি পেলে ভবিষ্যতে নিরাপদ চিকিৎসা ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
নবীনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ বা মামলা করা হয়নি। তবে অভিযোগ পেলে পুলিশ আইনি ব্যবস্থা নেবে। তদন্ত কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা দ্রুতই জেলা সিভিল সার্জনের কাছে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেবেন।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় নবীনগরের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। টাকা দিয়ে জীবনের মূল্য নির্ধারণের এই সংস্কৃতি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন অনেকেই।
Leave a Reply