নেত্রকোনায় শীতল পাটি শিল্পে ধস, পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় কারিগররা
সোহেল খান দূর্জয়, নেত্রকোনা : একসময় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক ছিল শীতল পাটি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, বাজারের প্রতিযোগিতা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ অঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প। সংশ্লিষ্টরা বলছেন—সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে এই শিল্প।
মোহনগঞ্জের ডিঙাপোতা হাওরপাড়ের জৈনপুর, হাতনী, ভাটাপাড়া, নোয়াগাও, হরিপুর ও তাহেরপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে যুগ যুগ ধরে শীতল পাটি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন শতাধিক পরিবার। তবে বারবার বন্যা, কাঁচামাল সংকট এবং ন্যায্য দাম না পাওয়ায় দিন দিন আগ্রহ হারাচ্ছেন কারিগররা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শীতল পাটি তৈরির প্রধান কাঁচামাল ‘মুর্তা’—যার দাম এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি। একটি পাটি তৈরি করতে সময় লাগে ২-৩ দিন, খরচ পড়ে ২০০-৩০০ টাকা, কিন্তু বিক্রি হয় মাত্র ৫০০-৬০০ টাকায়। এতে লাভের পরিমাণ খুবই কম।
কারিগর প্রমিলা রানী ঘোষ বলেন,
“আগে এই পাটি বানিয়ে ভালো আয় হতো। এখন খরচ বাড়লেও দাম বাড়েনি। তাই অনেকেই পেশা পরিবর্তন করছে।”
অন্যদিকে, মুর্তা সংগ্রহকারী মানিক দত্ত জানান,
“বর্ষায় মুর্তা সংগ্রহ সহজ হলেও বছরের বাকি সময় তা সংগ্রহ করতে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরতে হয়। এতে খরচও বাড়ে।”
বর্তমানে প্লাস্টিকের পাটির সহজলভ্যতা এবং কম দামের কারণে শীতল পাটির বাজারও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক কারিগর বাধ্য হয়ে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, যা তাদের ঋণের চক্রে আটকে ফেলছে।
কারিগর মিনতি রানী তালুকদার বলেন,
“৪০ বছর ধরে এই পেশায় আছি। এখন আর আগের মতো আয় নেই। সরকার যদি সহায়তা দেয়, সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারি—তাহলে এই শিল্প বাঁচানো সম্ভব।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও জানান, আগের তুলনায় পাটির উৎপাদন কমে গেছে। আগে যেখানে প্রতিটি হাটে অনেক পাটি উঠত, এখন তা সীমিত হয়ে ২০০-৩০০টির মধ্যে নেমে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতল পাটি শুধু একটি পণ্য নয়, এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে এই শিল্প। তাই এটিকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন—
কারিগরদের দাবি, মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া সরাসরি রাজধানীসহ বড় বাজারে বিক্রির সুযোগ এবং প্রচার বাড়ানো গেলে এই শিল্প আবার প্রাণ ফিরে পাবে।
👉 উপসংহার:
নেত্রকোনার শীতল পাটি শিল্প আজ টিকে থাকার লড়াইয়ে। তবে সঠিক উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আবারও দেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—এমনটাই বিশ্বাস স্থানীয় কারিগরদের।
📅 ০৫ এপ্রিল ২০২৬
📰 মনোলোক