
মাইনুল মিসির | মনোলোক :
মানুষের রাগ যখন হিতাহিত জ্ঞান হারায়, তখন তা কতটা ভয়ংকর হতে পারে—তারই এক নৃশংস উদাহরণ হয়ে রইল নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের শিশু অঙ্কিত হত্যাকাণ্ড। মাত্র ৩ বছরের এক অবুঝ শিশুর পায়ে সামান্য ধাক্কা লাগা কীভাবে একজন নারীর মধ্যে ‘ঘাতক’ সত্তাকে জাগিয়ে তুলল, তা আজ সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের জন্য এক বড় প্রশ্ন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও আকস্মিকতা
গত সোমবার দুপুরে যখন বাড়ির বড়রা কাজে ব্যস্ত, তখন উঠানে খেলছিল শিশু অঙ্কিত। সামান্য খুনসুটি চলছিল চাচি ফুলরানি বর্মণের সন্তানের সঙ্গে। কিন্তু সেই সামান্য বিবাদ আর পায়ে লাগা এক ধাক্কায় ফুলরানি বর্মণের ভেতরে জমে থাকা কোনো সুপ্ত ক্ষোভ বা তীব্র মানসিক অস্থিরতা তাকে ঠেলে দেয় এক চরম অপরাধের দিকে।
মনস্তাত্ত্বিক দিক: মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনেক সময় মানুষের দীর্ঘদিনের অবদমিত ক্ষোভ বা পারিবারিক কোন্দল কোনো একটি তুচ্ছ ঘটনার মাধ্যমে আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হয়। ফুলরানির এই নিষ্ঠুরতা কি শুধুই ওই মুহূর্তের রাগ, নাকি এর পেছনে পারিবারিক কোনো দীর্ঘস্থায়ী রেষারেষি কাজ করছিল—তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
হত্যার নৃশংসতা ও স্বীকারোক্তি
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এবং পরবর্তীতে আদালতে ফুলরানি বর্মণ (৪২) স্বীকার করেছেন যে, ঝগড়া ও পায়ে ধাক্কা লাগার কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি অঙ্কিতকে পাশের ঘরে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করেন।
”তার শিশু সন্তানের সঙ্গে ঝগড়া করছিল অঙ্কিত। এতে তিনি ক্ষিপ্ত হন। এক পর্যায়ে তার পায়ে ধাক্কা দেওয়ায় অঙ্কিতের প্রতি আরও ক্ষিপ্ত হন তিনি।” — ওসি, মোহনগঞ্জ থানা।
একটি পরিবার ও কয়েকটি ধ্বংসপ্রাপ্ত জীবন
নিহত অঙ্কিতের বাবা সাগর বর্মন ঢাকায় পোশাক কারখানায় কাজ করে জীবন গড়ার স্বপ্ন বুনছিলেন। দাদির আদরে গ্রামে আসা অঙ্কিত ফেরার কথা ছিল বাবার কাছে, কিন্তু ফিরল নিথর দেহ হয়ে। এ ঘটনায় পুলিশ চারজনকে আটক করেছে:
ফুলরানি বর্মণ: প্রধান অভিযুক্ত (চাচি)
রাজন চন্দ্র বর্মণ: চাচা
সুকুমার বর্মণ ও মায়ারানি বর্মণ: আত্মীয়
বর্তমানে তারা সবাই আদালতের নির্দেশে কারাগারে রয়েছেন।
মনোলোক বিশ্লেষণ: আমাদের সমাজ কোন দিকে?
এই ঘটনাটি কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, বরং আমাদের সামাজিক সহনশীলতা কমে যাওয়ার একটি অশনিসংকেত।
সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ: তুচ্ছ কারণে শিশুকে হত্যার মতো ঘটনা প্রমাণ করে যে, মানুষের মধ্যে অপরাধবোধের চেয়ে তাৎক্ষণিক আক্রোশ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্যের অবহেলা: পারিবারিক পরিবেশে নারীদের মানসিক চাপ বা বিষণ্ণতা অনেক সময় যথাযথ গুরুত্ব পায় না, যা পরবর্তীকালে এমন ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
মূল্যবোধের ক্ষয়: রক্তের সম্পর্কের ওপর যখন জিঘাংসা জয়ী হয়, তখন বুঝতে হবে পারিবারিক বন্ধনগুলো আলগা হয়ে যাচ্ছে।
উপসংহার
অঙ্কিত আর কোনোদিন তার বাবার কোলে ফিরবে না। তবে এই হত্যাকাণ্ড আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, রাগের নিয়ন্ত্রণহীনতা একটি সাজানো পরিবারকে মুহূর্তেই শ্মশানে পরিণত করতে পারে। আইন হয়তো ফুলরানির বিচার করবে, কিন্তু যে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধির কারণে সমাজ অঙ্কিতদের হারাচ্ছে, তার চিকিৎসা কোথায়?
তদন্ত চলমান রয়েছে। সমাজ ও পরিবারকে এখন ভাবতে হবে—আক্রোশ কি আমরা এভাবেই লালন করব, নাকি ভালোবাসায় আগলে রাখব আগামী প্রজন্মকে?