অপরাধ ও ন্যায় : সংকট থেকে সমাধানের পথ – হোসাইন আদনান
প্রকাশিত:
শনিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৫
২৩১
বার পড়া হয়েছে
হোসাইন আদনান / আলেম ও লেখক :
বর্তমান বাংলাদেশের সমাজে অপরাধের ঊর্ধ্বগতিকে অস্বীকার করা কঠিন। গত কয়েক বছরে খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, নারী নির্যাতন, মাদক ব্যবসা ও অর্থনৈতিক অপরাধসহ বিভিন্ন রকম অপরাধের হার চোখে পড়ার মতোভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা কিংবা টেলিভিশন পর্দায় এসব ঘটনা দেখা যায়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার ভাব জন্ম দেয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই? যে সমাজে মানুষ রাতে ঘুমাতে ভয় পায়, শিশু ছেলেমেয়েরা নিরাপদে বেড়িয়ে বেড়াতে পারে না? নিশ্চয়ই না। আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়নিষ্ঠ, এবং মোরালিটি সমৃদ্ধ সমাজের। কিন্তু কেন আমরা এ অন্ধকার থেকে বের হতে পারছি না? অপরাধ প্রবণতার মূল কারণগুলো কী? আর এর মোকাবিলায় আমরা কী করতে পারি?
অপরাধ প্রবণতার পেছনের কারণসমূহ :
অপরাধ শুধু মাত্র বাহ্যিক কারণেই বৃদ্ধি পায় না; এর গভীরে রয়েছে অন্তর্নিহিত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক সংকট। প্রথমেই বলতে হয়, মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি ও নৈতিকতার অবক্ষয়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট বলেছেন—
“যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য মুক্তির পথ করে দেন।” (সূরা আত-তালাক: ২) – এ কথার অর্থ হলো, আল্লাহভীতি মানুষের অন্তরে এমন এক জাগরণ, যা তাকে অবৈধ ও অবাঞ্ছিত কাজ থেকে বিরত রাখে। এই তাকওয়া (আল্লাহভীতি) ছাড়া অপরাধ ও পাপ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। বর্তমান সমাজে যখন মানুষ তাকওয়ার আলো হারিয়ে ফেলেছে, তখন হারাম ও হালাল বাছাই করার শক্তি ম্লান হয়ে যায়। ফলে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের সাহস যোগাচ্ছে। আইনের শাসন দুর্বল হলে অপরাধীরা শাস্তি ভয়ের বাইরে চলে যায়। আজকের বাস্তবতায় দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি, ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব অপরাধ দমনে বড় বাধা সৃষ্টি করেছে। অপরাধী যখন শাস্তি পায় না, তখন অপরাধ করা তাদের কাছে নিরাপদ মনে হয়। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্ব অপরাধ প্রবণতার অন্যতম প্রধান কারণ। রাসুল সা. বলেছেন— “দারিদ্র্য প্রায় কুফরের কাছাকাছি নিয়ে যায়।”
যখন একজন মানুষ জীবিকা নির্বাহে ব্যর্থ হয়, তখন সে সহজ অর্থের লোভে অপরাধের আশ্রয় নিতে পারে। বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ বেকারত্ব ও আয়ের অসমতা অপরাধ প্রবণতার পেছনে শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। চতুর্থত, পরিবার ও সামাজিক অবক্ষয় অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। পরিবার হলো মানুষের প্রথম শিক্ষালয়। যেখানে পিতা-মাতা সঠিক আদর্শ ও নৈতিক শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হন, সেখানে সন্তানরা বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে অনেক পরিবারে পারস্পরিক ভালোবাসার অভাব, সময়ের সংকট ও অসংলগ্নতা দেখা যায়, যা সামাজিক মূল্যবোধ ক্ষয় করতে সাহায্য করে। পঞ্চমত, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং অনৈতিক বিনোদনের বিস্তারও অপরাধ প্রবণতা বাড়াতে সহায়ক। ডিজিটাল মাধ্যমের মাধ্যমে সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, মাদক এবং অশ্লীল কনটেন্ট সহজলভ্য হওয়ায় তরুণ সমাজ এই চক্রে আবদ্ধ হচ্ছে।
সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর অপরাধের প্রভাব :
অপরাধ প্রবণতার ফলে সমাজে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে, যা মানুষের মানসিক শান্তি নষ্ট করে। বিনিয়োগ কমে যায়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপরাধ বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিদিন ভয়ের মধ্যে জীবনযাপন করে, যা একটি উন্নত সমাজ গঠনের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা।
গঠনমূলক সমাধান ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি:
অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে কেবল আইন শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি মানুষের অন্তরের সংস্কার জরুরি। ইসলামে অপরাধ দমনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা রয়েছে, যেগুলো আমাদের সমাজে বাস্তবায়ন করলে অপরাধ প্রবণতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আসবে।
প্রথমেই তাকওয়া ও নৈতিকতার পুনরুজ্জীবন। স্কুল, মাদ্রাসা ও পরিবারের শিক্ষায় কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক নৈতিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ছোটবেলা থেকেই আল্লাহভীতি ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে অপরাধের বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়া সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। ইসলামি বিধান অনুযায়ী অপরাধের শাস্তি দ্রুত ও ন্যায্যভাবে কার্যকর করা হয়, যা অপরাধীদের ভীত করে। বাংলাদেশে বিচার ব্যবস্থার দ্রুততা ও স্বচ্ছতা বাড়ানো হলে অপরাধ কমে আসবে।
তৃতীয়ত, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সহায়তা সৃষ্টি করতে হবে। বেকারদের জন্য প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ ও ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে তারা সৎ পথে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে। এটি অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর হাতিয়ার।
চতুর্থত, মাদকাসক্তি ও অনৈতিক বিনোদনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদক ও অশ্লীল কনটেন্ট অপরাধ বৃদ্ধির বড় উৎস। সমাজ ও সরকারকে যৌথভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইন প্রয়োগ করতে হবে।
পঞ্চমত, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। পিতা-মাতাদের উচিত সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাদের সঠিক দিশা দেওয়া। রাসুল সা. বলেছেন— “তোমরা প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” (বুখারি, মুসলিম)
পরিবারের ঘরে ঘরে নৈতিক শিক্ষা ও আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হলে অপরাধ প্রবণতা অনেক কমে যাবে। অপরাধমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য দরকার মানুষের অন্তরের সংস্কার। আল্লাহভীতি, ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পারিবারিক মায়া প্রতিষ্ঠিত না হলে সত্যিকারের নিরাপত্তা অর্জন কঠিন। আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত নিজেদের দায়িত্ব সচেতনভাবে পালন করা। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদেরকে সেই তাওফিক দান করেন এবং আমাদের সমাজে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন—আমিন।
Leave a Reply