
সৌদি–হুতি সংঘাত নতুন মোড়কে, রিয়াদে প্রাণঘাতী হামলার পর পাল্টা বিমান অভিযান
সানা বিমানবন্দর থেকে শুরু হওয়া উত্তেজনা এখন বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তাসংকটে রূপ নিয়েছে
মনোলোক : ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের মধ্যে সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণহানি ও ব্যাপক আহত হওয়ার ঘটনার পর ইয়েমেনের হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পাল্টা বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী। জ্বালানি অবকাঠামো, বিমান চলাচল এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ।
১৩ অক্টোবর প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি-সমর্থিত বাহিনী ইয়েমেনের রাজধানী সানার কাছে জ্বালানি ডিপো ও তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর সদর দপ্তরসংলগ্ন এলাকাও আলোচনায় এসেছে। এসব হামলার পর সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনের সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘিরে উত্তেজনা নতুন নয়। সানা সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী বিমানবন্দরের রানওয়ে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এর আগে ৩ জুলাই ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির জানাজায় অংশ নিতে একটি ইরানি বিমানে হুতি প্রতিনিধিদল যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ে।
তবে বিমানবন্দরে হামলার পেছনে কেবল জানাজায় অংশ নেওয়ার ঘটনাই একমাত্র কারণ ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত স্বাধীন প্রমাণ নেই। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও হুতিদের মধ্যে বৈধ কর্তৃত্ব, সামরিক চলাচল এবং ইরানের সঙ্গে হুতিদের সম্পর্কও এই সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট।
অক্টোবরের শুরু থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। আল জাজিরা ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষ অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হওয়ার কথা জানায়। পরবর্তী হামলার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
বেসামরিক বিমানবন্দর ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে এ ঘটনায় গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হুতিদের হামলার পাশাপাশি সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর ইয়েমেনে পাল্টা বিমান অভিযানও বেসামরিক মানুষের জীবন ও অবকাঠামোর জন্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ জনবহুল বিস্তীর্ণ এলাকার ওপর হুতিদের দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানার সক্ষমতাও তারা দেখিয়েছে। ফলে সৌদি আরবের উন্নত সামরিক সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও এই গোষ্ঠীকে সামরিকভাবে পরাস্ত করা সহজ হচ্ছে না।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার সুনির্দিষ্ট শতাংশ, সৌদি আরবের অধিকাংশ বিমানবন্দর অচল হয়ে পড়া কিংবা যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে হওয়ার মতো দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এসব দাবি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।
বাব আল-মান্দাব প্রণালী লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল। বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনার পাশাপাশি বাব আল-মান্দাব ঘিরে সংঘাত বাড়লে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, তেল পরিবহন ও পণ্যের দামে প্রভাব পড়তে পারে।
তবে ৫ অক্টোবর রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী বাব আল-মান্দাবের কাছের কৌশলগত অবস্থান পুনর্দখলের দাবি করেছে এবং মোখা বন্দরের দিকে অগ্রসর হয়েছে। ফলে প্রণালীটি বর্তমানে পুরোপুরি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে—এমন দাবি সঠিক নয়। এলাকাটির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাতের পক্ষগুলোর বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৩ অক্টোবর হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, তারা মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তেলের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ওয়াশিংটন পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী ধরনের সামরিক ভূমিকা নেবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের পাল্টা হামলা ও ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর অভিযানও সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারেনি। এ অবস্থায় যুদ্ধবিরতি, বেসামরিক স্থাপনায় হামলা বন্ধ, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হচ্ছে।
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা শুধু সামরিক শক্তির লড়াই নয়; এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে মানবিক সংকট আগে থেকেই গুরুতর। নতুন করে বিমান হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।
মনোলোকের পর্যবেক্ষণ: হুতিদের সামরিক সক্ষমতাকে উপেক্ষা করে কেবল শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে বেসামরিক বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলাকে কোনো পক্ষের জন্যই গ্রহণযোগ্য বলা যায় না। মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর যুদ্ধ ঠেকাতে সামরিক উত্তেজনা কমানো ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ এখন অত্যন্ত জরুরি।
সূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং সানা সেন্টার।
Reuters
Al Jazeera
Sana’a Center
ReutersFeed