
বিশেষ প্রতিবেদক, মনোলোক | রিয়াদ, সৌদি আরব :
সৌদি আরবের ঝকঝকে অট্টালিকা আর আধুনিকতার আবরণে ঢাকা পড়ছে এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি। দিন দিন দেশটিতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রবাসী নারী গৃহকর্মীদের মাদক সেবন ও বিক্রির প্রবণতা। আর এই মরণনেশার জালে তাদের জড়িয়ে ফেলছে একদল অসাধু চক্র, যাদের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে তথাকথিত ‘হাবিবি’ বা বয়ফ্রেন্ডরা। সম্প্রতি রাজধানী রিয়াদসহ বিভিন্ন প্রদেশে সৌদি প্রশাসনের বিশেষ অভিযানে এই অপরাধ জগতের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
টিকটক: অপরাধের নতুন ‘হান্টিং গ্রাউন্ড’
তদন্তে দেখা গেছে, এই অপরাধী চক্রের কার্যক্রম চলে মূলত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। এদের জীবনযাত্রা অদ্ভুত এবং বিপজ্জনক। তারা সারা দিন ঘুমিয়ে কাটায় এবং সূর্যাস্তের পর শুরু হয় তাদের ‘ডিজিটাল এক্টিভিটি’। টিকটকে চটকদার ভিডিও তৈরি করে তারা মূলত নিজেদের টার্গেট বা শিকার খুঁজে বের করে।
বিশেষ করে বাসাবাড়ি থেকে পালিয়ে আসা অসহায় নারী গৃহকর্মীদের লক্ষ্য বানায় এই চক্র। যারা ভালো জীবনের আশায় কাজ ছেড়ে পালিয়ে আসে, তাদের আশ্রয় দেওয়ার নাম করে মরণনেশা ইয়াবা বা শিসার জগতে ঠেলে দেওয়া হয়।
‘হাবিবি’ সংস্কৃতির নেপথ্যে ভয়াবহতা
তথা কথিত এই ‘হাবিবি’রা আসলে অপরাধ জগতের মধ্যস্বত্বভোগী। তারা নারী গৃহকর্মীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে প্রথমে মাদকাসক্ত করে, তারপর তাদের ব্যবহার করে মাদক সরবরাহকারী (কুরিয়ার) হিসেবে। প্রশাসনের নজর এড়াতে নারী গৃহকর্মীদের ব্যবহার করা হয় নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে। অনেক ক্ষেত্রে এই নারীরা কেবল মাদক নয়, বড় ধরনের জালিয়াতি, এমনকি অপহরণের মতো নৃশংস অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছেন।
প্রশাসনের সাঁড়াশি অভিযান
রাজধানী রিয়াদে এই চক্রের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। সম্প্রতি সৌদি পুলিশের এক বিশেষ অভিযানে রিয়াদের বিভিন্ন গোপন আস্তানা থেকে একাধিক নারী ও তাদের সহযোগী পুরুষদের গ্রেফতার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ও অবৈধ অর্থ।
প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান:
“আমরা লক্ষ্য করছি যে, টিকটকের মাধ্যমে একটি অপরাধী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। তারা প্রবাসী নারীদের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে। তবে আমরা প্রযুক্তির ব্যবহার করেই এই চক্রগুলোকে শনাক্ত করছি এবং তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”
ভুক্তভোগীদের জীবন ও বিপন্ন ভবিষ্যৎ
অনুসন্ধানে জানা যায়, অধিকাংশ নারী গৃহকর্মী দালালের প্ররোচনায় বা ব্যক্তিগত হতাশা থেকে বাসাবাড়ি ছেড়ে পালান। এরপর তারা আইনি সুরক্ষা হারিয়ে অপরাধী চক্রের দাসে পরিণত হন। দিনের আলোতে তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকে আর অন্ধকার নামলেই শুরু হয় নেশা আর অপরাধের কারবার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক সচেতনতা এবং টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ না আনলে এই ভয়াবহতা আরও বাড়তে পারে। প্রবাসে এসে যারা স্বাবলম্বী হতে চেয়েছিলেন, তাদের এই বিপথগামিতা কেবল তাদের জীবনই নষ্ট করছে না, বহির্বিশ্বে নিজ দেশের ভাবমূর্তিও সংকটে ফেলছে।
মনোলোকের সাথে থাকুন, সত্যের সন্ধানে।
Leave a Reply