
মাইনুল মিসির. মনেলোক | ১০ এপ্রিল, ২০২৬.
মেসোপটেমিয়া কিংবা প্রাচীন মিশরের মতো প্রদীপ্ত সভ্যতাগুলো কালের গর্ভে তলিয়ে গেলেও, ৭ হাজার বছরের ঐতিহ্য নিয়ে আজও সগর্বে টিকে আছে ইরান। গ্রিসের দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডার থেকে শুরু করে রক্তপিপাসু চেঙ্গিস খান—ইতিহাসের পাতায় যারাই ইরান জয়ের নেশায় মেতেছেন, শেষ পর্যন্ত তারা হয় পিছু হটেছেন, নয়তো মিশে গেছেন পারস্যের সংস্কৃতিতে। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘পুরো সভ্যতা ধ্বংস’ করে দেওয়ার হুমকির মুখে ইরান যেভাবে অবিচল থেকেছে, তা বিশ্বজুড়ে আবারও এক পুরোনো প্রশ্নকে উসকে দিয়েছে: কোন জাদুবলে বারবার বহির্শত্রুকে রুখে দেয় এই দেশ?
সিকান্দার যখন পারস্যের প্রেমে মগ্ন
খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ অব্দে পারস্য সম্রাট তৃতীয় দারিয়ুসকে পরাজিত করে রাজধানী পার্সিপোলিস দখল করেছিলেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। বলা হয়, মত্ত অবস্থায় তিনি পারস্যের বিশাল প্রাসাদগুলো পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সামরিকভাবে জয়ী হলেও মানসিকভাবে আলেকজান্ডার নিজেই হেরে গিয়েছিলেন পারস্যের সংস্কৃতির কাছে।
ফার্সি সাহিত্যে ‘সিকান্দার’ নামে পরিচিত এই বীর পারস্যের পোশাক ও রাজসভার রীতিনীতি গ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, গ্রিক ও পারস্যের সংস্কৃতির মিলন ঘটাতে তিনি গণবিবাহের আয়োজন করেছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, আলেকজান্ডার ইরান জয় করতে গিয়ে নিজেই একজন ‘পারসি’ হয়ে উঠেছিলেন।
মঙ্গোলদের গ্রাস করেছিল যে সংস্কৃতি
একই পরিণতি হয়েছিল দুর্ধর্ষ মঙ্গোলদের। চেঙ্গিস খান এবং তার নাতি হালাকু খান বুখারা, সমরকন্দ ও নিশাপুরের মতো শহরগুলো ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তারা ইরানি জাতীয়তাবাদকে মুছে ফেলতে পারেননি। উল্টো দেখা গেল, মঙ্গোল শাসকরাই পারস্য শৈলীতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করছেন এবং ইরানি পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। এই ‘সাংস্কৃতিক সংক্রমণ’ ইরানকে বারবার রক্ষা করেছে।
কেন ইরানকে ধ্বংস করা অসম্ভব?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইরানের অপরাজেয় থাকার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করে:
ভৌগোলিক দুর্গ: ইরানের বিশাল ভূখণ্ড এবং দুর্ভেদ্য পাহাড়ের সারি একে প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেয়। কোনো বহির্শত্রুর পক্ষে পুরো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ রাখা প্রায় অসম্ভব।
সাংস্কৃতিক শেকড়: রাজনৈতিকভাবে পতন ঘটলেও ইরানের সমাজ কাঠামো ও ভাষা (ফার্সি) অত্যন্ত শক্তিশালী। আক্রমণকারীরা একসময় বুঝতে পারে, শাসন করতে হলে তাদের ইরানি সংস্কৃতির সাহায্য নিতেই হবে।
আঞ্চলিক কেন্দ্র: ইরানের কোনো একটি রাজধানীর পতন ঘটলেও দেশটির বিভিন্ন আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলো স্বকীয়তা বজায় রাখতে পারে, যা রাষ্ট্রকে পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে।
ট্রাম্প বনাম ইরান: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?
সাম্প্রতিক সময়ে আধুনিক মারণাস্ত্রের হুমকি দিয়েও ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের ‘সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’গুলোতে আঘাতের কথা বলেছিলেন, তখন বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। শেষ পর্যন্ত সংঘাত থামিয়ে যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটতে হয়েছে মার্কিন প্রশাসনকেও। ইতিহাস বলছে, তলোয়ার দিয়ে ইরানকে ক্ষতবিক্ষত করা গেলেও এর আত্মাকে বশ করা যায়নি।
সাত হাজার বছর পেরিয়েও ইরান তার স্বাধীন সত্তা নিয়ে টিকে আছে। আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পিছু হটা যেন সেই প্রাচীন সত্যকেই আবারও প্রমাণ করল—ইরানকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়, কারণ ইরান কেবল একটি দেশ নয়, একটি জীবন্ত সভ্যতা।
Leave a Reply