
সোহেল খান দূর্জয়- নেত্রকোনা : বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা নেত্রকোনায় মাদকবিরোধী অভিযান এখন প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা। থানা-পুলিশ, ডিবি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে নিয়মিত গ্রেপ্তার ও মাদক উদ্ধারের খবর মিলছে। তবে অভিযান ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়লেও কমছে না মাদকের রাজত্ব। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলায় মোট ৫১১টি মাদক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬৯৫ জন। একই সময় উদ্ধার করা হয়েছে ২৯ হাজার ৮৭৪ পিস ইয়াবা, ৮৩৮ পিস ট্যাপেন্টাডল, ২১.৯৮ গ্রাম হেরোইন, ২২০ কেজি গাঁজা, ৬১১ লিটার চোলাই মদ, ৬৩১ অ্যাম্পুল ইনজেকশন, এক হাজার ৬০৮ বোতল ভারতীয় মদ, এক হাজার ১০০ বোতল ওয়াস, ২৬ বোতল ফেনসিডিল এবং ৩০টি গাঁজাগাছ। পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেলার সীমান্তঘেঁষা কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলায় মাদকসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কলমাকান্দা থানায় ৪২টি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৭৩ জন এবং দুর্গাপুর থানায় ৪০টি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫৮ জন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তসংলগ্ন কয়েকটি বাজার ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় সন্ধ্যার পর মাদক বিক্রেতাদের আনাগোনা বেড়ে যায়। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর কলমাকান্দার গুজাগলিয়া ফায়ার সার্ভিস এলাকা, পূর্ববাজার ড্রেইনপাড়, সিলহালা মোড় ও মনতলা হাসপাতাল এলাকা এবং দুর্গাপুর পৌর শহরের দক্ষিণপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প, মোক্তারপাড়া ও সদর ইউনিয়নের মাকরাইল আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় মাদক তৎপরতা চলে।স্থানীয় এক দোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাইরে থেকে কিছু যুবক এসে দ্রুত লেনদেন করে চলে যায়। মাঝে মাঝে পুলিশ অভিযান চালালে তারা লুকিয়ে পড়ে। আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলোতে বসবাস তুলনামূলক কম হওয়ায় এসব জায়গা এখন মাদকসেবীদের আড্ডা ও লেনদেনের নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে। মাঝে মধ্যে অভিযান হলেও স্থায়ী নজরদারির অভাবে মাদক কারবারিরা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় ভারত থেকে বিভিন্ন কৌশলে মাদকের প্রবেশ ঘটে। কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ সীমান্ত এবং পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় পুরো এলাকা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা কঠিন। মাদকের প্রভাব শুধু পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ নয়,এর ভয়াবহ ছাপ পড়ছে অনেক পরিবারে।
এদিকে জেলার আটপাড়া উপজেলার পুখলগাঁও গ্রামের বাসিন্দা রাজন মিয়ার পরিবার এখন চরম সংকটে। ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর একটি পরিত্যক্ত গুদামের পাশ থেকে তাঁর ভাসমান লাশ উদ্ধার করা হয়। পেশায় তিনি ছিলেন চা বিক্রেতা। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মাদক ব্যবসায়ীদের তথ্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে দেওয়ার সন্দেহ থেকেই তাঁকে হত্যা করা হয়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন দিশাহারা তাঁর স্ত্রী-সন্তান। স্থানীয়দের মতে, শুধু গ্রেপ্তার ও মামলা দিয়ে মাদক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সরবরাহের উৎস বন্ধ, সীমান্ত নজরদারি জোরদার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা এবং পরিবারভিত্তিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। সীমান্তঘেঁষা জেলা হওয়ায় আন্তদেশীয় চক্রের সংযোগও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক প্রতিরোধ এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. নাজমুল হক বলেন, সীমান্তপথে যেসব রুট দিয়ে মাদক পরিবহন করা হয়, সেগুলোতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, জেলাকে মাদকমুক্ত করতে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোও খুব জরুরি।নেত্রকোনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) রেজওয়ান আহমেদ বলেন, ‘নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় সব সময় নজরদারি রয়েছে। তথ্য পাওয়া মাত্রই বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ ও বিজিবি উভয় বাহিনীই নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্তরিকভাবে কাজ করছে।