
দিয়ার প্রেসার নামতে নামতে ৪০শে আসলো প্রেসার একদম লো। আজ তিনদিন ধরে। দিয়ার মা নীলা অনেক কষ্টে কিছু টাকা মেনেজ করে ডিম,দুধ আর স্যালাইন কিনে খাওয়াচ্ছে। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। টাকা থাকলে হয়তো একটা ডাক্তার দেখাতো অথবা হাসপাতালে নিয়ে যেতো। আত্মীয় স্বজনের কাছেও যাওয়ার মত মুখ নেই। কতবার তাদের থেকে টাকা আনবে। একবার প্রাইভেটের জন্য, একবার কোচিংফি,ফরম ফিলাপ সবই তো ওদের কাছ থেকে চেয়ে নিতে হয়। আত্মীয়রা নীলার ফোন পেলেই ভয় পায়, কল ধরতে চাই না। অনেকে তো ধরেই না। এসব চিন্তা করতে করতে রাস্তায় কখন যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে নীলা বুঝতে পারেনা। অবশেষে আবিষ্কার করে একটা ঔষধের দোকানে। অনেক লোকের ভিরে সে বসে আছে। বুঝতে আর কিছু বাকি রইলো না। নীলা বলে উঠলো আমি ঠিক আছি, আচ্ছা প্রেসার কত। ঔষধের দোকানদার বলল। মটেও ঠিক নেই। বাসায় কাউকে কল দিন। আপনার প্রেসার ২১০/১৩০। নীলা হসলো। ও কিছুনা। আচ্ছা দিচ্ছি। জানে কল দিলে কেউ ধরবে না। তাও সবার অনুরোধে কল দিলো। সত্যি কেউ ধরলো না। নীলা আবার হাসলো মনে হয় সবাই ব্যাস্ত ঈদের শপিং নিয়ে।

লেখক পরিচিতি : নাসরিন হীরা
[ লেখক পরিচিতি : নাসরিন হীরা ]
* জন্ম চট্টগ্রাম জেলার হালিশহরে। বাবা ছিলেন মাওবাদী। সবাই তাকে কমরেড নামে ডাকতো। বাবা বিশ্বাস করতেন নারী স্বাধীন। সেই সুবাদে সংস্কৃতি অঙ্গ বিচরণ ছিল ছোটবেলা থেকেই। ছোটবেলা তিনি নিত্য শিল্পী হিসেবে ছিল চট্টগ্রাম জেলায় এবং ১৫ বছর বয়স থেকে নাটকের জীবন শুরু। প্রথম নাটক ছিল সুবসন নির্বাচন। এই নাটকটি জগতে পদার্পণ ঘটলো নাসরিন হীরার। ১৯৯৮ সাল থেকে তির্যক নাট্যগোষ্ঠীর সাথে জড়িত। বর্তমানে অভিনয়ের পাশাপাশি লিখালি ও নির্মাতা হিসেবে কাজ করছে চট্টগ্রামে। *
আত্মীয় স্বজনের কাছেও যাওয়ার মত মুখ নেই। কতবার তাদের থেকে টাকা আনবে। একবার প্রাইভেটের জন্য, একবার কোচিংফি,ফরম ফিলাপ সবই তো ওদের কাছ থেকে চেয়ে নিতে হয়। আত্মীয়রা নীলার ফোন পেলেই ভয় পায়, কল ধরতে যেতে পারবো সমস্যা হবে না। বলে স্বাভাবিক ভাবে বাসায় চলে আসলো। এত লোকের প্রশ্নের চাপে দিয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিল নীলা। কলিং বেল দিতেই দরজা খুলে দিলো ১০ বছরের ছোট ছেলে সূর্য। মা দিয়া আপা কেমন করছে। নীলা দৌড়ে দিয়ার কাছে যায়। দেখা দিয়ার চোখ সাদা হয়ে আছে, মুখ ফ্যাকাসে, হাত-পা হিমশীতল, নিথর ভাবে পড়ে জোড়ে জোড়ে নিশ্বাস নিচ্ছে। নীলা তাড়াতাড়ি দুধ গরম করে খাওয়ালো। কোন উপায় নেই। একটা উপায় মাথায় এলো।
সন্তান হওয়ার পর মুরব্বিরা বলতো, “বাচ্চাদের অসুখ হলে মা বুকে নিলে অর্ধেক অসুখ ভালো হয়ে যায়”। নীলা তো হাসপাতালে নিতে পারবে না ঔষধ ও খাওয়াতে পারবে না। তাই দিয়াকে বুকে জড়িয়ে অনেক গুলো চুমু খেলো। মায়ের চুমু খাওয়া দেখে সূর্যও বোনের মুখে অনেকগুলো চুমু খেয়ে বলে” মা কান্না করো না দিদি ভালো হয়ে যাবে”। নীলা সূর্য কে অনেক আদর দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলো। দিয়া আবার ছটফট করছে। দিয়াকে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতে নীলা বলল। “মা’রে যদি মরে যাস, মা’কে ক্ষমা করে দিস। মা তোদের জন্য কিছুই করতে পারিনি, তবে তোদের ভালো রাখার অনেক চেষ্টা করেছি” কি করব বল আমার আত্মীয় স্বজনরা আমার থেকেও অনেক গরীব। আমরাতো খেতে পাই, ওরা তা ও পায়না। আসলে যাদের ধনসম্পত্তি যত বেশী তারা তত বেশী গরীব থাকে”। বলতে বলতে রাত গভীরে সব নিরব হয়ে গেলো। দিয়ার কোন শব্দ নেই, নীলার ও কোন শব্দ নেই।
সকাল বেলা সবার কলিং বেলের শব্দে সূর্যের ঘুম ভাঙ্গলো। মা আর দিয়া কে ডেকে যখন ঘুম থেকে তোলতে পারছে না। সূর্য নিজে নিজে চেয়ারে দাড়িয়ে দরজা খুলল।ততক্ষণে সব শেষ। সবাই সরাসরি বেডরুমে ঢুকে দেখে নীলার বুকে দিয়া। দু’জনেই পাথরের মত শক্ত হয়ে আছে। আত্মীয়রা মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল- মোবাইল চার্জে সাইলেন করা ১২৩ টি মিস কল…….
ছোট গল্প
অবাক পৃথিবী
নাসরিন হীরা
Leave a Reply