
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী | মনোলোক, প্রকাশিত: ৫ মে, ২০২৬ : রাজশাহীতে প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের উপস্থিতিতেই একটি সরকারি দপ্তরের টেন্ডার বাক্স ছিনতাইয়ের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। আজ মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) কার্যালয়ে এই ঘটনা ঘটে। এ সময় সেখানে পুলিশ মোতায়েন থাকলেও তাদের ভূমিকা নিয়ে চরম নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ উঠেছে, যা টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
ঘটনাটি যেভাবে ঘটল
আরডিএ অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পুরনো ও অচল মালামাল (যেমন: বিলবোর্ড, গাছ, সোলার প্যানেল, ব্যাটারি এবং লিফটের ভাঙা যন্ত্রাংশ ইত্যাদি) বিক্রির জন্য সম্প্রতি একটি নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। গত ২৭ এপ্রিল থেকে দরপত্র গ্রহণ শুরু হয় এবং আজ মঙ্গলবার দুপুর ১টা পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারিত ছিল। শেষ দিনের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় এবং টেন্ডার বাক্সের নিরাপত্তায় সকাল থেকেই সেখানে পুলিশ মোতায়েন ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালে দরপত্র জমা দিতে এসে স্থানীয় যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতাকর্মী হঠাৎ আপত্তি তোলেন। তাদের দাবি ছিল, আগের দিনগুলোতে জমা পড়া সমস্ত দরপত্র বাতিল করতে হবে এবং শুধুমাত্র আজ (মঙ্গলবার) যেসব দরপত্র জমা পড়বে, সেগুলোই গ্রহণযোগ্য হবে। আরডিএ কর্মকর্তারা তাঁদের এই অযৌক্তিক দাবির বিষয়ে নিয়মকানুন ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেও রাজনৈতিক কর্মীরা তা মানতে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে পুলিশের উপস্থিতিতেই তারা জোরপূর্বক টেন্ডার বাক্সটি ছিনতাই করে নিয়ে যায়। কিছু সময় পর বাক্সটি আবার ফেরত দেওয়া হলেও ততক্ষণে দরপত্রের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা
ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, আরডিএ ভবনের ভেতরে যখন রাজনৈতিক কর্মীরা টেন্ডার বাক্সটি নিয়ে টানাটানি ও ছিনতাই করছিল, তখন পুরো সময়জুড়েই পুলিশ সদস্যরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তাদের কার্যত কোনো বাধা দিতে বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেখা যায়নি। পুলিশের এমন ভূমিকার কারণে উপস্থিত সাধারণ দরদাতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
৪৫০ শিডিউলের বিপরীতে জমা মাত্র ৯টি!
জানা গেছে, প্রায় আড়াই লাখ টাকা সমমূল্যের এসব মালামাল ক্রয়ের জন্য প্রায় ৪৫০ জন দরদাতা শিডিউল সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু ছিনতাই ও ভীতিকর পরিস্থিতির কারণে অনেকেই শেষ মুহূর্তে দরপত্র জমা দিতে পারেননি। পরবর্তীতে দুপুর আড়াইটার দিকে যখন টেন্ডার বাক্সটি খোলা হয়, তখন চারটি গ্রুপের বিপরীতে মাত্র ৯টি দরপত্র পাওয়া যায়।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে আরডিএ-এর সহকারী প্রকৌশলী কাজী আসাদুজ্জামান গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
“পুলিশের সামনেই এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও ন্যাক্কারজনক। জোরপূর্বক বাক্স নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। যদিও পরে তা ফেরত দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ভেতরের দরপত্রগুলো সঠিকভাবে পুনরায় সংরক্ষণ করা হয়েছে কিনা বা কোনো রদবদল হয়েছে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। আমরা এই ঘটনায় দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
অন্যদিকে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন বিষয়টি কিছুটা হালকা করার চেষ্টা করে বলেন, “মূলত ভুল বোঝাবুঝির কারণে বাক্সটি নেওয়া হয়েছিল এবং পরে তা ফেরত দেওয়া হয়েছে।” তবে তিনি যোগ করেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আরডিএ কর্তৃপক্ষ মামলা না করলে পুলিশ নিজ উদ্যোগেও (সুয়োমোটো) প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেবে।”
নগরজুড়ে তোলপাড়
রাজশাহীর মতো একটি বিভাগীয় শহরের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতরে পুলিশের সামনেই রাজনৈতিক কর্মীদের এমন প্রকাশ্য টেন্ডার বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনায় নগরজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহল বলছেন, প্রশাসনের এমন নিষ্ক্রিয় ভূমিকা বজায় থাকলে সরকারি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সাধারণ ব্যবসায়ীদের আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।
Leave a Reply