
মনোলোক ডেস্ক: কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার গোড়াই আনন্দবাজার এলাকায় এক মধ্যবয়সী নারীকে কেন্দ্র করে তীব্র অলৌকিক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিখোঁজ হওয়ার পরদিন সকালে ৫৩ বছর বয়সী সাজেদা বেগমকে একটি উঁচু তেঁতুল গাছের মগডালে বসা ও শোয়া অবস্থায় দেখতে পায় স্থানীয়রা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ‘জীন আতঙ্ক’ ছড়িয়ে পড়লেও, মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা এটিকে দেখছেন একজন মানুষের গভীর মানসিক সংকটের চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে।
ঘটনাটি ঠিক কী ঘটেছিল?
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ৫ মে মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন মোঃ আবু সাইদের স্ত্রী সাজেদা বেগম। পরদিন বুধবার সকালে বাড়ির পাশের একটি পুকুরপাড়ের উঁচু তেঁতুল গাছের ডালে তাকে দেখতে পান প্রতিবেশীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তাকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি গাছের ডালে বসে কিছু খাচ্ছেন।
তার ছেলে তাকে উদ্ধার করতে গাছে ওঠার চেষ্টা করলে তিনি উপর থেকে মিষ্টি ছুঁড়ে মারেন।
পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা এলে তিনি পানিতে লাফ দেওয়ার হুমকি দেন। এক পর্যায়ে তিনি গাছ থেকে পানিতে লাফ দিলে ফায়ার সার্ভিস তাকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে।
কেন ছড়ালো ‘জীন আতঙ্ক’?
একটি ৫৩ বছর বয়সী নারীর পক্ষে কোনো মই বা সাহায্য ছাড়া এত উঁচু গাছের মগডালে উঠে যাওয়া এবং অস্বাভাবিক আচরণ করা দেখে স্থানীয়রা একে কোনো অলৌকিক বা জীন-ভূতের কাণ্ড বলে ধরে নিয়েছেন। ফলে পুরো এলাকায়, বিশেষ করে শিশুদের মাঝে তীব্র ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
মনোরোগবিদ্যার দৃষ্টিকোণ: পর্দার আড়ালে আসল সত্য কী?
মনোলোক-এর পক্ষ থেকে এই ধরণের আচরণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, সমাজে কোনো মানুষ তীব্র মানসিক ট্রমা, বিকার বা বিশেষ কিছু মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে এমন অবিশ্বাস্য আচরণ করতে পারেন।
সাইকোসিস বা তীব্র মানসিক বিকার (Psychosis): এই অবস্থায় একজন মানুষ বাস্তব জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তিনি এমন কিছু দেখতে বা শুনতে পান যার কোনো অস্তিত্ব নেই (Hallucination)। হয়তো কোনো অদৃশ্য কণ্ঠের আদেশ শুনে বা তীব্র আতঙ্কে আত্মরক্ষার জন্য তিনি অবচেতনভাবেই ওই গাছে চড়ে বসেছিলেন।
ম্যানিক এপিসোড (Manic Episode): বাইপোলার ডিজঅর্ডারের তীব্র পর্যায়ে মানুষের শরীরে ও মনে অতিরিক্ত শক্তির সঞ্চার হয়। সাধারণ সময়ে যা অসম্ভব, তীব্র মানসিক উত্তেজনার মুহূর্তে একজন মানুষ অবলীলায় সেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করে ফেলতে পারেন।
ডিলিউশন বা অবাস্তব বিশ্বাস (Delusion): আক্রান্ত ব্যক্তি মনে করতে পারেন তার বিশেষ কোনো অলৌকিক ক্ষমতা তৈরি হয়েছে, যার কারণে তিনি গাছে বসে মিষ্টি খাওয়ার মতো অদ্ভুত আচরণ করেন।
সামাজিক সচেতনতা ও আমাদের করণীয়
স্থানীয় কিছু সচেতন মানুষ এটিকে মানসিক সমস্যা হিসেবে ইঙ্গিত করলেও, সিংহভাগ মানুষই গুজবে কান দিচ্ছেন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে—
“এই ধরণের রোগীকে অলৌকিক তকমা দিয়ে কবিরাজি চিকিৎসা বা ওঝার কাছে নিয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও আশঙ্কাজনক হতে পারে। ফায়ার সার্ভিস যেভাবে তাকে উদ্ধার করেছে তা প্রশংসনীয়, তবে এখন তার দ্রুত প্রয়োজন একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের (Psychiatrist) চিকিৎসা।”
কোনো ঘটনা যুক্তি দিয়ে মেলাতে না পারলেই তাকে ‘জীন-ভূত’ আখ্যা দেওয়া আমাদের গ্রামীণ সমাজের একটি পুরোনো ব্যাধি। সাজেদা বেগমের এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজ এখনো কতটা অসচেতন। কুড়িগ্রামের এই ঘটনাটিতে আতঙ্কিত না হয়ে, ওই নারীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং শিশুদের মন থেকে ভয় দূর করতে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
Leave a Reply