
নিজস্ব প্রতিবেদক, মনোলোক | শ্যামনগর : প্রকৃতির অমোঘ টান আর জীবিকার কঠোর সংগ্রামে সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে আবারও বাঘের আক্রমণের শিকার হলেন এক মৌয়াল। সাতক্ষীরা রেঞ্জের পশ্চিম সুন্দরবনের কাছিকাটা এলাকার পায়রাটুনি খালে রোববার (১০ মে) সকালে এই রোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে। বাঘের থাবায় গুরুতর জখম বাবলু গাজী (৪৮) বর্তমানে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ঘটনার বিবরণ
স্থানীয় ও বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ডুমুরিয়া গ্রামের মালেক গাজীর ছেলে বাবলু গাজী একদল মৌয়ালের সঙ্গে মধু সংগ্রহে সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। রোববার সকাল ৮টার দিকে যখন তারা গভীর বনে মধু আহরণ করছিলেন, তখন হঠাৎ করেই ঝোঁপের আড়াল থেকে একটি বিশালাকায় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার বাবলুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
মুহূর্তের মধ্যে বাঘের থাবায় বাবলু মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার আর্তচিৎকারে সহকর্মীরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। তবে দ্রুতই তারা সাহসিকতার পরিচয় দেন। হাতে থাকা লাঠিসোটা নিয়ে এবং সমস্বরে চিৎকার শুরু করলে বাঘটি শিকার ছেড়ে বনের গহীনে পালিয়ে যায়।
দীর্ঘ ও দুঃসহ পথ অতিক্রম
বনের গহীনে আধুনিক চিকিৎসার কোনো সুযোগ না থাকায় সহযোগীরা বাবলুকে উদ্ধার করে নৌকায় তোলেন। রোববার সারাদিন এবং সারারাত দীর্ঘ নৌপথ পাড়ি দিয়ে সোমবার (১১ মে) সকাল ৭টার দিকে তাকে লোকালয়ে নিয়ে আসা সম্ভব হয়। নীলডুমুর ঘাটে পৌঁছানোর পর পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।
বর্তমান অবস্থা ও প্রতিক্রিয়া
বাবলু গাজীর পিতা মালেক গাজী, যিনি নিজেও ওই সময় সাথে ছিলেন, কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন:
“আমরা একসাথেই মধু সংগ্রহ করছিলাম। চোখের পলকে বাঘটা আমার ছেলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আল্লাহর রহমতে ওর বন্ধুরা পাশে থাকায় আজ ও বেঁচে আছে। কিন্তু ওর শরীরের অবস্থা খুব খারাপ।”
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বাবলু গাজীর পিঠে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গভীর ক্ষত রয়েছে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় তার অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক।
এ বিষয়ে বন বিভাগের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের সহকারী স্টেশন কর্মকর্তা ইরফান হোসেন জানান, বিষয়টি তারা গুরুত্বের সাথে দেখছেন এবং আহত মৌয়ালের চিকিৎসার খোঁজখবর রাখছেন।
বনজীবীদের ঝুঁকি
সুন্দরবনের মৌয়ালদের জীবন যে কতটা অনিশ্চিত, এই ঘটনা যেন আবারও তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। মধু আহরণ মৌসুমে জীবিকার তাগিদে প্রতিবছরই অনেক মৌয়ালকে বাঘের মুখে পড়তে হয়। সচেতন মহল বলছেন, বনজীবীদের নিরাপত্তার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থার উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।
মনোলোক – সত্যের সন্ধানে নির্ভীক
Leave a Reply