
মাইনুল মিসির | মনোলোক ডিজিটাল ডেস্ক
সাম্প্রতিক জাতীয় ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো (NCRB)-র রিপোর্ট ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় যে লাল সঙ্কেত দিচ্ছে, তার মূল কেন্দ্রে রয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের নাগরিকদের ক্রমবর্ধমান অপরাধ প্রবণতা। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে ধৃত বিদেশি অপরাধীদের সিংহভাগই—৩,০৯১ জন—বাংলাদেশি। কিন্তু এই ব্যাধি কি কেবল ভারতের সীমানায় সীমাবদ্ধ? ব্রিটেন, আমেরিকা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকেও একই ধরনের উদ্বেগের খবর আসছে। কেন বিশ্বজুড়ে একটি জাতির কিছু অংশের মানুষের মধ্যে এই অপরাধমূলক প্রবণতা মাথাচাড়া দিচ্ছে? মনোলোক-এর বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এল নেপথ্যের গভীর কারণগুলো।
১. ‘বেটার লাইফ’ ও মরীচিকার হাতছানি
বিদেশে গেলেই ভাগ্য বদলে যাবে—এই আদিম আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী মানব পাচারকারী সিন্ডিকেট। গ্রামের সাধারণ যুবক থেকে শুরু করে শিক্ষিত বেকাররা দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। যখন তারা বিদেশে গিয়ে দেখে কোনো কাজ নেই বা নথিপত্র অবৈধ, তখন অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই তারা অন্ধকার জগতে পা রাখছে। বৈধ আয়ের পথ বন্ধ হওয়ায় জালিয়াতি, চুরি বা ড্রাগ পাচারই হয়ে উঠছে তাদের টিকে থাকার রসদ।
২. পাসপোর্টের আড়ালে পরিচয় সংকট
রিপোর্টে দেখা গেছে, বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে অধিকাংশ মামলাই পাসপোর্ট আইন ও নথিপত্র জালিয়াতি সংক্রান্ত। এর মনস্তাত্ত্বিক দিকটি হলো ‘পরিচয় গোপন করা’। জাল পরিচয়ে ভিন্ন রাষ্ট্রে
প্রবেশের পর তারা এক ধরনের দায়মুক্তির মানসিকতায় ভোগে। তাদের ধারণা থাকে, যেহেতু আসল পরিচয় গোপন আছে, তাই অপরাধ করে ধরা পড়লেও সহজে পার পাওয়া যাবে। এই ‘অ্যানোনিমিটি’ বা ছদ্মনাম ব্যবহারের সুযোগ অপরাধ করার সাহস বাড়িয়ে দেয়।
৩. ড্রাগ সিন্ডিকেট ও গ্লোবাল নেটওয়ার্ক
ভারতের এনসিআরবি রিপোর্ট এবং আন্তর্জাতিক ক্রাইম ইনডেক্স বলছে, বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মায়ানমার থেকে ইয়াবা বা অন্যান্য নিষিদ্ধ ড্রাগ ভারতে বা মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি ‘ক্যারিয়ার’দের ব্যবহার করা হচ্ছে। অভাবের সুযোগ নিয়ে মাফিয়া চক্রগুলো তাদের অল্প টাকায় নিয়োগ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের পেশাদার অপরাধী বানিয়ে তুলছে।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা
অভিবাসন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং দালালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশিদের অপরাধের পথে ঠেলে দেওয়ার অন্যতম বড় কারণ। এছাড়া বিদেশের মাটিতে আইনি সহায়তার অভাব বা কনস্যুলার সার্ভিসের সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ বিপদে পড়া প্রবাসীরাও অনেক সময় স্থানীয় গ্যাংস্টারদের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
পশ্চিমবঙ্গ কেন হটস্পট?
ভৌগোলিক সান্নিধ্য, ভাষার মিল এবং দীর্ঘ ছিদ্রযুক্ত (porous) সীমান্ত পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে সহজ গন্তব্য করে তুলেছে। ২০২৪ সালে পশ্চিমবঙ্গে ৯৯২টি বিদেশি অপরাধের মামলা প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলটি কেবল অপরাধের ক্ষেত্র নয়, বরং এটি অপরাধীদের জন্য একটি ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
উপসংহার
বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশিদের এই নেতিবাচক পরিসংখ্যান কেবল একটি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং সৎভাবে কাজ করতে যাওয়া লক্ষ লক্ষ প্রবাসীর জীবনও কঠিন করে তুলছে। অপরাধের এই উর্ধ্বমুখী গ্রাফ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা এবং অভিবাসন প্রক্রিয়ার আমূল সংস্কার।
মনোলোক-এর পর্যবেক্ষণ: অপরাধ কেবল আইনি সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর আর্থ-সামাজিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ। দারিদ্র্য আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার মাঝখানে যে চোরাবালি রয়েছে, সেখানেই তলিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার বাংলাদেশি স্বপ্ন।
Leave a Reply