
নিজস্ব প্রতিবেদক, মনোলোক | হাতিয়া : সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ কেড়ে নিয়েছিল প্রাণপ্রিয় মানুষকে। ৫৪টি বছর পেরিয়ে গেছে, স্বজনেরা চোখের জল শুকিয়ে তাকে মৃত বলে মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের লিখন যে এত বিস্ময়কর হতে পারে, তা আজ দেখল নোয়াখালীর হাতিয়াবাসী। দীর্ঘ ৫৪ বছর পর নিজের পৈতৃক ভিটায় জীবন্ত ফিরে এলেন নিখোঁজ হওয়া জেলে ছৈয়দ আহাম্মদ।
ফিরে আসার সেই মুহূর্ত
নোয়াখালীর হাতিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের এমপির পুল সংলগ্ন ফজলি বাড়িতে গত মঙ্গলবার দুপুরে এক বৃদ্ধ এসে যখন নিজের পরিচয় দেন, তখন গোটা এলাকায় স্তব্ধতা নেমে আসে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, কণ্ঠনালিতে অপারেশনের চিহ্ন—তবুও ঝাপসা স্মৃতি হাতড়ে যখন নিজের বাবার নাম ‘মৃত ধন মিয়া’ বললেন, তখন উপস্থিত প্রবীণরা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যান। পরে তার সহোদর আবুল খায়ের ওরফে জমিদার এবং ছোটবেলার খেলার সাথীরা তাকে শনাক্ত করেন।
যেভাবে হারিয়েছিলেন ছৈয়দ
স্বজনদের দেওয়া তথ্যমতে, প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক আগে কুতুবদিয়া উপকূলে ভয়াবহ ট্রলারডুবির শিকার হন ছৈয়দ আহাম্মদ। পরিবারের সবাই ধরে নিয়েছিলেন তিনি সাগরেই সলিল সমাধি লাভ করেছেন। তখন তার স্ত্রী ছামনা খাতুনের কোলে ছিল দুগ্ধপোষ্য শিশু সন্তান আকরাম। বাবার চেহারা না দেখেই আজ ৫৪ বছরে পা দিয়েছেন সেই সন্তান।
পরিচয়হীন ভবঘুরে জীবন
জানা গেছে, ট্রলারডুবির পর সাগরে ভাসতে ভাসতে কোনোভাবে ভারতের উপকূলে পৌঁছান তিনি। এরপর শুরু হয় যাযাবর জীবন। ভারতের আজমীর শরীফসহ বিভিন্ন মাজার ও মসজিদে কাটিয়েছেন দশকের পর দশক। সম্প্রতি ভারতের হাওড়া স্টেশনে সর্বস্ব হারানোর পর বিএসএফ তাকে বাংলাদেশের সীমান্তে হস্তান্তর করে। সেখান থেকেই স্মৃতির টানে পথ চিনে তিনি ফিরে আসেন নিজের জন্মভূমিতে।
আবেগ এবং সংশয়
বাবার ফিরে আসায় ছেলে আকরাম যেমন আবেগাপ্লুত, তেমনি এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে কিছু পারিবারিক জটিলতাও। বাবার সাথে থাকা অর্থ এবং পরিচর্যার দায়িত্ব নিয়ে স্বজনদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মতবিরোধ। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা একে দেখছেন এক ‘অলৌকিক প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে।
হাতিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ কবির হোসেন জানান, ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। স্বজনেরা চাইলে প্রশাসন থেকে প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা প্রদান করা হবে।
৫৪ বছর পর ফিরে আসা এই মানুষটির চোখে এখন কেবলই প্রশান্তি। জীবনের শেষ সময়টুকু নিজের ভিটায় আপনজনদের পাশে কাটাতে চান এই ঘরমুখো নাবিক।
Leave a Reply