
মাইনুল মিসির / মনোলোক | ১৪ মে, ২০২৬ : মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ আর রণসজ্জার দামামার মধ্যেই দীর্ঘ ৯ বছর পর বেইজিংয়ের মাটিতে পা রাখলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার (১৩ মে) বেইজিং বিমানবন্দরে তাকে দেওয়া লালগালিচা সংবর্ধনা এবং চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেংয়ের আতিথেয়তা বিশ্বরাজনীতির জন্য এক বড় বার্তা। তবে এই সফরের আড়ালে যে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলছে, তা কোনো সামরিক মহড়ার চেয়ে কম নয়।
ট্রাম্পের ‘পরাশক্তি’ বয়ান: আত্মতুষ্টি নাকি কৌশল?
বিমানবন্দরে নেমেই ট্রাম্পের সেই পরিচিত ভঙ্গি—“আমরাই দুই পরাশক্তি। সামরিক শক্তির দিক থেকে আমরাই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ।” মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য কেবল আত্মশ্লাঘা নয়, বরং আলোচনার টেবিলের দখল নেওয়ার একটি পূর্বপরিকল্পিত কৌশল। ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা যখন স্থবির, তখন চীনকে পাশে পেতে চাইলেও ট্রাম্প তার ‘আলফা মেল’ ইমেজ বজায় রাখতে মরিয়া। তিনি বুঝিয়ে দিতে চাইছেন, এই জোট কোনো বন্ধুত্বের সমীকরণ নয়, বরং পরিস্থিতির প্রয়োজনে দুই শক্তিশালী খেলোয়াড়ের সাময়িক মেলবন্ধন।
শি জিনপিংয়ের নিরব কূটনীতি
অন্যদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অবস্থান বরাবরই শান্ত কিন্তু দৃঢ়। ইরান থেকে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন। ট্রাম্প যখন সামরিক হুঙ্কার দিচ্ছেন, শি তখন কূটনৈতিক নিশ্চয়তার জাল বুনছেন। তেহরান সম্ভবত বেইজিংকে তাদের ‘নিরাপত্তা গ্যারান্টার’ হিসেবে দেখতে চায়। এখানেই শুরু হচ্ছে এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক খেলা—ট্রাম্প কি চীনের মধ্যস্থতা মেনে নিয়ে নিজের ‘একলা চলো’ নীতি বিসর্জন দেবেন, নাকি পরিস্থিতির চাপে নতি স্বীকার করবেন?
সংকটের মনস্তত্ত্ব: যুদ্ধ বনাম স্থায়িত্ব
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতি ও জনমনে। শান্তি আলোচনার অচলাবস্থা সাধারণ মানুষের মনে যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, তার প্রতিফলন ঘটছে বিশ্ববাজারে তেলের দামে।
বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো:
আস্থার সংকট: পাকিস্তান মধ্যস্থতা করলেও ট্রাম্প ও খামেনি প্রশাসনের মধ্যে আস্থার অভাব এখন তুঙ্গে।
অনিশ্চয়তার ভয়: হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা মানেই বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়া, যা বেইজিংকে বিচলিত করছে।
তৃতীয় পক্ষের প্রভাব: রাশিয়া ও চীনের কূটনৈতিক নিশ্চয়তা ছাড়া ইরান কোনো চুক্তিতে যেতে নারাজ, যা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ইগোতে আঘাত হানতে পারে।
শেষ কথা
স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষক ড্যান গ্রেজিয়ারের মতে, ট্রাম্প প্রকাশ্যে সাহায্যের কথা অস্বীকার করলেও পর্দার আড়ালে শি জিনপিংয়ের প্রভাবকে ব্যবহার করতে চাইবেন। শেষ পর্যন্ত এই সফর কি কেবলই বাণিজ্যের লেনদেন হবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের আগ্নেয়গিরি শান্ত করার মহৌষধ হয়ে উঠবে? উত্তর লুকিয়ে আছে বৃহস্পতি ও শুক্রবারের সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে, যেখানে দুই নেতার করমর্দনের চেয়েও তাদের চোখের ভাষা এবং না বলা কথাগুলোই বেশি অর্থবহ হয়ে উঠবে।
Leave a Reply