
মনোলোক : মার্কিন আধিপত্যের অবসান কি কেবলই কোনো হলিউড চিত্রনাট্য কিংবা অ্যাপল টিভি সিরিজের কাল্পনিক দৃশ্য? সময় বলছে—না। বরং এই দৃশ্যপট এখন বাস্তবে চিত্রিত হচ্ছে ইরানের রুক্ষ এবং বন্ধুর ভূখণ্ডে। যে ওয়াশিংটন একসময় পেশিশক্তির জোরে বিশ্ব শাসন করত, সেই হোয়াইট হাউস এখন চীনের সাথে অর্থনৈতিক যুদ্ধে ক্লান্ত। আর এই ক্লান্তির শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে তারা তাদের শেষ তুরুপের তাস ‘সেনাবাহিনী’কে ব্যবহার করতে গিয়েই বড় ধরনের কৌশলগত ধাক্কার সম্মুখীন হয়েছে।
ভেনেজুয়েলা থেকে ইরান: একটি ভুল হিসাবের খতিয়ান
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে ভেনেজুয়েলা ছিল মার্কিন প্রশাসনের কাছে কেবল একটি ‘মুখরোচক’ মহড়া। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের আগে মার্কিন সরকার তাদের কিংবদন্তিতুল্য সামরিক শক্তির ওপর ভরসা করে ইরানের সংকটের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করতে চেয়েছিল। লক্ষ্য ছিল, পূর্ণ শক্তি নিয়ে ইরানকে দমনের পর সেই দাপট নিয়ে চীনের দরবারে হাজির হওয়া। কিন্তু বিধিবাম! ইরানের ভূখণ্ড এবং তাদের প্রতিরোধ যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
“আমেরিকানরা যে যুদ্ধ ৪ দিনে শেষ করতে চেয়েছিল, আজ ৭০ দিন পার হওয়ার পরও তার কোনো কূল-কিনারা নেই।”
রণক্ষেত্র থেকে আলোচনার টেবিল: অনুনয় করছে ওয়াশিংটন
শক্তি প্রদর্শনের যে দাম্ভিকতা নিয়ে আগ্রাসন শুরু হয়েছিল, তার করুণ পরিণতি এখন দৃশ্যমান। পর্দার আড়ালে এখন উল্টো সুর বাজছে হোয়াইট হাউসের কণ্ঠে। যারা একসময় হুকুম দিত, তারা এখন ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কিছুটা সীমিত করার জন্য তেহরানের কাছে অনুনয়-বিনয় করছে।
একসময় যে প্রেসিডেন্ট বিজয়ের উন্মাদনা নিয়ে সফর স্থগিত করেছিলেন, তিনি আজ চীনের দরবারে হাজির হয়েছেন এক ভঙ্গুর ও রিক্ত অবস্থানে। ইরানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকার কারণে সৃষ্ট এই দুর্বলতা বেইজিংয়ের নজর এড়ায়নি। যার ফলে তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দিতেও দ্বিধা করছে না চীন।
বেইজিংয়ের সমীকরণ ও ওয়াশিংটনের পিছুটান
ভূ-কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের সামরিক শক্তির যে মিথ বিশ্বজুড়ে প্রচলিত ছিল, ইরানের প্রতিরোধের মুখে তা এখন এক স্পষ্ট দুর্বলতায় পর্যবসিত হয়েছে। পরিস্থিতি কতটা বদলেছে তা বোঝা যায় ট্রাম্পের সুর পরিবর্তনে।
আগে: বেইজিংকে সরাসরি সামরিক হুমকি।
এখন: চীনা নেতাকে তোষামোদ করে বলা হচ্ছে, “চীন সুন্দর এবং আপনি একজন মহান নেতা।”
হরমুজ থেকে মালাক্কা: এক অভূতপূর্ব কৌশলগত মৈত্রী
ইরানের এই প্রতিরোধ এখন আর কেবল পশ্চিম এশিয়ার সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে হরমুজ প্রণালী থেকে মালাক্কা প্রণালী পর্যন্ত বিস্তৃত এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনারা খুব ভালো করেই জানে যে ইরানের এই প্রতিরোধ তাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার:
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি ইরান ও চীনের মধ্যে এক অভূতপূর্ব কৌশলগত অংশীদারিত্বের পথ প্রশস্ত করেছে। ইরানের রুক্ষ পাহাড়ে মার্কিন সামরিক দম্ভের যে পরীক্ষা হয়েছিল, তাতে ওয়াশিংটনের ‘ফেল’ করার খেসারত দিতে হচ্ছে বৈশ্বিক আধিপত্য হারানোর মাধ্যমে।
সূত্র: পার্সটুডে/এমআরএইচ/
সম্পাদনা: নিউজ ডেস্ক, মনোলোক।
Leave a Reply