
ঢাকা, ১৬ মে ২০২৬: পারস্য উপসাগরের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবার আরব দেশগুলোর জন্য এক ভয়াবহ অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালীতে সম্ভাব্য সংকটের জেরে যেকোনো মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যেতে পারে পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্রগুলো (Desalination Plants)। আর এমনটা ঘটলে, সমগ্র অঞ্চলের ৬২ মিলিয়ন (৬ কোটি ২০ লাখ) মানুষের জন্য পানীয় জলের সরবরাহ মাত্র ১০ দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইরানের বার্তা সংস্থা ‘তাসনিম নিউজ’-এর বরাত দিয়ে ‘পার্সটুডে’ এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে।
প্রকৃতির চরম পরিহাস: একটি স্থায়ী নদীও নেই
আরব উপদ্বীপের চরম শুষ্ক জলবায়ু এবং কোনো স্থায়ী নদীর অনুপস্থিতি পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (GCC/পিজিসিসি)-র সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক পানি সংকটের মুখোমুখি করেছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই অঞ্চলটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম “চরম পানি সংকট” কবলিত এলাকা। পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয় নিচের মাথাপিছু বার্ষিক পানি সরবরাহের চিত্রে:
দেশ
বার্ষিক মাথাপিছু পানি সরবরাহ (ঘনমিটার)
ওমান
২৯৬ ঘনমিটারেরও কম
সৌদি আরব
৭৫ ঘনমিটার
বাহরাইন
৭৫ ঘনমিটার
কাতার
মাত্র ২০ ঘনমিটার
অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, বছরে মাথাপিছু ১,০০০ ঘনমিটারের কম পানি থাকাকে তীব্র সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পোটোম্যাক নদীর চেয়েও কম প্রাকৃতিক পানি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ছয়টি আরব দেশের মোট নবায়নযোগ্য ভূগর্ভস্থ এবং ভূপৃষ্ঠের পানির উৎস বছরে মাত্র প্রায় ৪.১৪ বিলিয়ন ঘনমিটার। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য মোট প্রাকৃতিক পানির এই পরিমাণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাধারণ নদী ‘পোটোম্যাক’-এর বার্ষিক প্রবাহের চেয়েও কম।
একই সাথে, এই অঞ্চলের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ভূগর্ভস্থ পানির উৎসগুলো (যেমন: উম্ম আল-রিদুমা-দাম্মাম পানির স্তর এবং নিওজিন সিস্টেম) অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে ভূগর্ভে যেটুকু পানি অবশিষ্ট আছে, তা এতটাই লবণাক্ত যে কার্যত ব্যবহারের অযোগ্য।
“লবণাক্ত পানির নরক” এবং হরমুজ নির্ভরতা
প্রাকৃতিক পানির তীব্র অভাব মেটাতে এই দেশগুলো কৃত্রিম উপায়ে সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে লবণাক্ত পানি পরিশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পানি উৎপাদন বিস্ময়করভাবে ৩১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে এই অঞ্চলে ৩,৪০১টি লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্র রয়েছে, যা বিশ্বের মোট কারখানার প্রায় ১৯ শতাংশ এবং বিশ্বের মোট দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতার ৩৩ শতাংশ (২২.৬ মিলিয়ন ঘনমিটারের বেশি)। এই অতি-নির্ভরতার কারণেই অঞ্চলটিকে বিশেষজ্ঞরা “লবণাক্ত পানির নরক” বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
ইরানের কৌশলগত সুবিধা ও আরব দেশগুলোর অস্তিত্বের প্রশ্ন
পানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পারস্য উপসাগরের দুই পাড়ের মধ্যে এক বিশাল কৌশলগত ব্যবধান রয়েছে। বিশাল নদী, অসংখ্য বাঁধ এবং প্রচুর অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক উৎসের কারণে সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার ওপর ইরানের নির্ভরতা খুবই সামান্য। ইরানের দৈনিক পানি পরিশোধন ক্ষমতা মাত্র ১.৭ মিলিয়ন ঘনমিটার, যা আরব দেশগুলোর তুলনায় মাত্র ৭ শতাংশ।
এই ভূ-প্রাকৃতিক পার্থক্যের কারণে হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ আরব দেশগুলোর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, এই অঞ্চলের হাজার হাজার কোটি ডলারের উন্নত প্রকৌশল ও পানি পরিশোধন ব্যবস্থা পুরোপুরি হরমুজ জলপথের স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল। কোনো কারণে এই জলপথ অবরুদ্ধ বা সংঘাতগ্রস্ত হলে, আরব দেশগুলোতে এক ফোঁটা পানির জন্য হাহাকার পড়ে যাবে।
Leave a Reply