
মনোলোক / : ১০ বছরের নিষ্পাপ শিশু তাহসিন। পবিত্র কুরআনের ১৫ পারার হাফিজ। এই বয়সে যার মেতে থাকার কথা ছিল পড়ালেখা আর শৈশবের দুরন্তপনায়, দীর্ঘ নয়টি মাস তাকে পার করতে হয়েছে এক জীবন্ত নরকে। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষকের হাতে নয়, শিশুটি নির্মম, অমানবিক ও পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে তার নিজেরই বাসায়। আর এই বর্বরতায় প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন তার জন্মদাত্রী মা ও নিজের আপন খালাদের মতো নিকটাত্মীয়রা।
বাস্তবে রূপ নিল ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা’: তাহসিনের শরীরের এমন কোনো অংশ নেই যেখানে আঘাতের চিহ্ন নেই। পুরো শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে দেওয়া হয়েছে। তবে সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, এতদিন সমাজে ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা’ কথাটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হলেও তাহসিনের জীবনে তা বাস্তবিক রূপ নিয়েছে। নির্যাতনকারী ওই ব্যক্তি তাহসিনকে নির্মমভাবে পেটানোর পর ক্ষতস্থানে ব্লেড দিয়ে পোস (চিড়) দিত। এরপর নির্যাতনকারীর নির্দেশে তাহসিনের নিজের মা সেই রক্তাক্ত ক্ষতস্থানে লবণ এবং গুঁড়ামরিচ মিশিয়ে দিত। এই পৈশাচিক কাজে তাহসিনের দুই খালাও সরাসরি জড়িত ছিল।
যেভাবে চলত বন্দিদশায় নির্যাতন: তদন্তে জানা যায়, তাহসিনের বাবা একজন প্রবাসী। তিনি জীবিকার তাগিদে দেশের বাইরে থাকায় বাসায় মা, দুই খালা, বোন ও খালাতো বোনসহ পাঁচজন নারী থাকতেন। এই সুযোগে ওই বাসায় এক পরপুরুষের যাতায়াত শুরু হয়। তাহসিনের ভাষ্যমতে, সে ওই লোককে চেনে না। লোকটি তার মা ও খালাদের সাথে লুডু খেলত এবং খালাদের সাথে একই বিছানায় ঘুমাত। এই অনৈতিক ও সন্দেহজনক বিষয়গুলো দেখে ফেলার কারণেই সম্ভবত তাহসিনের মুখ বন্ধ করতে এবং তাকে ধীরে ধীরে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে এই নির্যাতন চালানো হতো।
নির্যাতনের সময় তাহসিনের মা ও খালারা মিলে তার দুই হাত পেছনের দিকে জানালার গ্রিলের সাথে শক্ত করে বেঁধে রাখত। এরপর ওই লোক হাতের কাছে যা পেত—লাঠি, রড বা পাইপ—তা দিয়ে তাহসিনকে অনবরত আঘাত করত। তাহসিনের চিৎকার যাতে বাইরে না যায়, সেজন্য পরবর্তীতে তার মুখে স্কচটিপ পেঁচিয়ে বা গামছা বেঁধে নির্যাতন চালানো হতো।
উদ্ধার অভিযান ও সত্য উন্মোচন: দীর্ঘদিন ধরে তাহসিনের ঘর থেকে আসা গগনবিদারী আর্তচিৎকার শুনতে পাচ্ছিলেন স্থানীয় তরুণ আশিক। তিনি কৌতূহলী হয়ে খোঁজ নিতে গেলে তাহসিনের মা এবং ওই নির্যাতনকারী ব্যক্তি ধমকের সুরে বলেন, “বাপ তার ছেলেকে মারছে, তাতে তোমার কী?” কিন্তু বিগত ১৫-২০ দিন ধরে হঠাৎ কোনো আওয়াজ না পাওয়ায় আশিক ও তার বন্ধুরা আশঙ্কায় পড়েন যে শিশুটিকে হয়তো মেরেই ফেলা হয়েছে।
এরপর আশিক, আনসার, দেওয়ান তাকওয়াসহ হিলভিউ টাওয়ার ও খাদিমপাড়ার বেশ কিছু সচেতন তরুণ দলবদ্ধ হয়ে ওই বাসায় খোঁজ নিতে যান। সেখানে তারা তাহসিনের কঙ্কালসার ও ক্ষত-বিক্ষত শরীরের করুণ অবস্থা দেখতে পান। সাথে সাথে তারা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করে পুলিশ ডাকেন। পুলিশ এসে ঘটনাস্থল থেকে মূল নির্যাতনকারীকে গ্রেফতার করে।
পরবর্তীতে তাহসিনের প্রবাসী বাবার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং জানান, তার বাসায় কোনো পুরুষের থাকার কথা নয় এবং তিনি এই নির্যাতনের বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন। তাহসিনও ভয়ে বা মায়ের কঠোর নজরদারির কারণে বাবার সাথে ফোনে কখনো এসব বলতে পারেনি।
গুজব ও বিভ্রান্তি নিরসন: ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ এটিকে ‘মাদরাসা শিক্ষকের হাতে নির্যাতন’ বলে ভুলভাবে প্রচার করছেন। এমনকি শাহবাগ এলাকার এক জনৈক নেতা পুরো ঘটনার কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করে ভুল তথ্য পোস্ট করেছেন। প্রকৃত সত্য হলো, তাহসিনকে প্রায় নয় মাস আগেই মাদরাসা থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল এবং এই দীর্ঘ সময় সে তার নিজের বাড়িতেই মা, খালা ও ওই পরপুরুষের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছিল। এর সাথে কোনো মাদরাসা বা শিক্ষকের সম্পৃক্ততা নেই।
ন্যায়বিচারের দাবি: এই লোমহর্ষক ঘটনাটি চাক্ষুষ করার পর হিলভিউ টাওয়ার ও খাদিমপাড়ার যুবসমাজ এবং সাধারণ মানুষ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মানবাধিকার কর্মী ও স্থানীয় সচেতন মহল তাহসিনের আত্মীয়দের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন, যেন এই মামলায় চুল পরিমাণও ছাড় দেওয়া না হয়। কেবল মূল নির্যাতনকারীই নয়, বরং যে মা ও খালারা এই পাশবিক নির্যাতনে ইন্ধন ও সরাসরি সহযোগিতা জুগিয়েছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
Leave a Reply