
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, মনোলোক তেহরান, ১৯ মে ২০২৬ —
আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলমান চরম যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই এক নজিরবিহীন ও অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে ইরান সরকার। দেশের প্রয়োজনে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত—এমন শত শত তরুণ-তরুণীর জন্য রাজধানী তেহরানের রাস্তায় রাস্তায় আয়োজন করা হলো এক জমকালো গণবিয়ের। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত বিশেষ ‘জান-ফিদা’ (জীবন উৎসর্গ) কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এই নবদম্পতিরা দেশের জন্য ‘আত্মোৎসর্গ’ করার এক আবেগঘন শপথ নিয়েছেন।
ইমাম হোসেন স্কয়ারে ‘জানফিদা’ দম্পতিদের ঢল
গতকাল সোমবার (১৮ মে) শেষ বিকেলে তেহরানের বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক ও বড় বড় চত্বরে একযোগে এই বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় তেহরানের সুপরিচিত ইমাম হোসেন স্কয়ারেই একসাথে ১১০টিরও বেশি দম্পতির বিয়ে দেওয়া হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ভয়াবহ যুদ্ধটি বর্তমানে একটি সাময়িক ও ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির কারণে কিছুটা শান্ত রয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক হামলার হুমকি অব্যাহত রাখায়, দেশের সাধারণ মানুষের মনোবল চাঙ্গা রাখতেই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এই রাজকীয় বিয়ের অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
মানবঢাল হতে ৩ কোটিরও বেশি মানুষের নিবন্ধন!
জানা গেছে, এই গণবিয়েতে অংশ নেওয়া দম্পতিরা ইরানের বিশেষ ‘জান-ফিদা’ কর্মসূচিতে নিজেদের নাম লিখিয়েছেন। এর অর্থ হলো, যুদ্ধ যদি আবারও তীব্র রূপ নেয়, তবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, পারমাণবিক কেন্দ্র ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে শত্রুদেশের বিমান হামলা থেকে বাঁচাতে এরা প্রয়োজনে মানবঢাল বা মানবশৃঙ্খল তৈরি করে নিজেদের জীবন বাজি রাখবেন।

যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেই তেহরানে রাজকীয় গণবিয়ে: দেশের জন্য ‘জীবন উৎসর্গ’-এর শপথ নিলেন শত শত তরুণ-তরুণী
ইরান সরকারের দাবি অনুযায়ী, সাধারণ জনগণের পাশাপাশি দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফের মতো শীর্ষ নেতারাও এই তালিকায় নাম দিয়েছেন। বর্তমানে দেশটিতে এই কর্মসূচিতে নাম লেখানো মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ৯২৩ জনে।
সামরিক জিপে চড়ে এলেন বর-কনে
এদিনের বিয়ের আয়োজনটি ছিল এককথায় দেখার মতো। সাধারণ বিলাসবহুল কোনো গাড়ি নয়, বরং রঙিন বেলুন ও ফুল দিয়ে সাজানো মাউন্ট করা মেশিনগানবাহী সামরিক জিপে চড়ে বিয়ের আসরে হাজির হন নবদম্পতিরা। মাঠের বিশাল মঞ্চটি সাজানো হয়েছিল বর্ণিল সাজে। মঞ্চের ঠিক ওপরেই শোভা পাচ্ছিল দেশটির বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা সাইয়্যেদ মুজতাবা খামেনেয়ীর বিশাল এক ছবি। উল্লেখ্য, যুদ্ধের প্রথম দিনেই শত্রুশিবিরের হামলায় তাঁর বাবা ও সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেয়ী শহীদ হওয়ার পর তিনি এই দায়িত্বে আসেন।
‘যুদ্ধ চললেও জীবন থেমে থাকবে না’
মেহর নিউজ এজেন্সির ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সাদা রঙের দৃষ্টিনন্দন ইসলামি বিয়ের পোশাক (চাদর ও ওড়না) পরা এক কনে হাসিমুখে তাঁর বরের পাশে দাঁড়িয়ে ক্যামেরার সামনে বলেন:
“দেশ এখন যুদ্ধের মধ্যে আছে ঠিকই, কিন্তু তাই বলে তরুণ-তরুণীদের জীবন বা বিয়ে তো আটকে থাকতে পারে না। আমরা প্রমাণ করতে চাই যে আমরা ভয় পাই না।”
আরেক জন বর তাঁর হবু স্ত্রীকে পাশে নিয়ে অত্যন্ত আনন্দিত কণ্ঠে বলেন, “ইসলামের ইতিহাসে হযরত আলী (আ.) ও হযরত ফাতেমা (আ.)-এর পবিত্র বিয়ের দিনটিতে (১ জিলহজ) আমাদের এই শুভ কাজ হচ্ছে, এটি আমাদের জন্য অনেক বড় ভাগ্যের ব্যাপার। আমরা তাঁদের দোয়া ও বরকত নিয়ে পথ চলতে চাই।”
বিয়ের এই আনন্দঘন মুহূর্ত দেখতে এবং নতুন বর-কনেদের শুভেচ্ছা জানাতে চত্বরগুলোতে হাজার হাজার সাধারণ মানুষের ঢল নামে। উপস্থিত শুভাকাঙ্ক্ষীদের হাতে ছিল লাল গোলাপ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই জনগণের মধ্যে দেশপ্রেমের চেতনা ধরে রাখতে এবং শত্রুকে প্রতিরক্ষার বার্তা দিতে ইরান সরকার প্রায় প্রতিদিনই এমন নানা রকম বড় বড় গণসমাবেশের আয়োজন করে আসছে, যার সর্বশেষ উদাহরণ হয়ে থাকল এই ‘কারাভান অব লাভ’ বা ভালোবাসার মিছিল।
সূত্র: পার্সটুডে/মেহর নিউজ/এএফপি
Leave a Reply