
বিশেষ প্রতিবেদক, মনোলোক
ঢাকা | ২০ মে, ২০২৬
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ৭ বছরের শিশু রামিসা আক্তার হত্যার ঘটনাটি কেবল একটি অপরাধের খতিয়ান নয়; এটি আমাদের সামাজিক বিশ্বাস, নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক মনস্তত্ত্বের ওপর এক চূড়ান্ত আঘাত। মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি বহুতল ভবনে ঘটে যাওয়া এই নৃশংসতা প্রমাণ করে যে, চেনা প্রতিবেশী কিংবা পাশের ফ্ল্যাটের বন্ধ দরজার ওপারেও ওত পেতে থাকতে পারে চরম বিকৃত মনস্তত্ত্ব।
মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে পপুলার স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের পর দ্রুত অভিযানে নামে পুলিশ। ডিএমপির মিরপুর জোনের ডিসি মোস্তাক সরকার জানিয়েছেন, মূল অভিযুক্ত রিকশা মেকানিক সোহেল রানা (৩০/৩২) ঘটনার পর জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে গেলেও সন্ধ্যায় তাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে তার স্ত্রী স্বপ্নাকেও আটক করে পুলিশ।
বিশ্বাসের ১৭ বছর বনাম এক ঘণ্টার পৈশাচিকতা
যে ভবনে রামিসার পরিবার দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বসবাস করছে, যেখানে প্রতিটি প্রতিবেশী চেনা এবং প্রতিটি কোণ বিশ্বাসের—সেখানে এমন ঘটনা স্তব্ধ করে দিয়েছে সবাইকে। ঘটনার দিন সকালে বড় বোনকে এগিয়ে দিতে বের হয়েছিল রামিসা। এরপরই সে নিখোঁজ হয়।
রান্নাঘরে ব্যস্ত মা পারভীন আক্তার যখন মেয়েকে না পেয়ে খুঁজতে বের হন, তখন পাশের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে পড়ে ছিল রামিসার মাত্র একটি জুতো। সেই অবরুদ্ধ দরজার ভেতরের নিস্তব্ধতাই জানান দিচ্ছিল এক ভয়াবহতার। পরবর্তীতে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে খাটের নিচ থেকে শিশুটির মূল দেহ এবং শৌচাগার থেকে তার খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, শিশুটিকে পাশবিক নির্যাতনের পর অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।
কাগজের আইন বনাম বাস্তবতার ক্রুরতা
বাংলাদেশে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০’ (সংশোধনী ২০২৫) অনুযায়ী শিশু ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে মাগুরার একটি মামলায় দ্রুততম সময়ে ডিএনএ রিপোর্ট ও বিচার শুরুর জোরালো আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বৈশ্বিক ও জাতীয় পরিসংখ্যানের চিত্রটি এখনো চরম হতাশার।
বিচারের হার: বিশ্বজুড়ে যৌন সহিংসতার ভুক্তভোগীদের মাত্র ১০ শতাংশ বিচার পান। বাংলাদেশে এই হার আরও উদ্বেগজনক।
মামলাহীন অপরাধ: পরিসংখ্যান বলছে, কেবল ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই অন্তত ৫৫টি শিশু নির্যাতনের ঘটনায় কোনো মামলাই দায়ের হয়নি।
দীর্ঘসূত্রতা: বছরের পর বছর চলা তদন্ত, সাক্ষীর অভাব এবং আইনি মারপ্যাঁচে আসামিদের জামিনে বেরিয়ে আসা সমাজকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
ভয়ের মনস্তত্ত্ব: ঘরে-বাইরে নিরাপত্তাহীন অভিভাবক
এই ঘটনাটি ঢাকা শহরের প্রতিটি বাবা-মায়ের মনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের জন্ম দিয়েছে। চেনা প্রতিবেশী যখন এমন খুনিতে পরিণত হয়, তখন সন্তানকে কোথায় নিরাপদ রাখা যাবে—এই প্রশ্নটি এখন প্রতিটি পরিবারের। মাদরাসা, স্কুল, খেলার মাঠ কিংবা নিজের ফ্ল্যাটের করিডোর—সবখানেই এখন এক অদৃশ্য আতঙ্ক।
“পাশের দরজার মানুষটাকে আজকাল আর চেনা যায় না। যতদিন আইন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে, ততদিন আমাদের প্রতিটি সন্তানই এক একটি অদৃশ্য ঝুঁকিতে বাস করবে।”
সময়ের দাবি: আমূল সংস্কার ও ফাস্ট ট্র্যাক ট্রাইব্যুনাল
লিপ-সার্ভিস বা ক্যামেরার সামনে আশ্বাসের দিন শেষ। রামিসার এই রক্ত যেন ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলে, সেজন্য এখন রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক পর্যায়ে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে:
ফাস্ট ট্র্যাক ট্রাইব্যুনাল: শিশু নির্যাতনের প্রতিটি মামলা স্বতন্ত্র ফাস্ট ট্র্যাক ট্রাইব্যুনালে নিয়ে সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে রায় এবং ৬ মাসের মধ্যে তা কার্যকর করতে হবে।
পুলিশ ভেরিফিকেশন: প্রতিটি আবাসিক এলাকায় বা ফ্ল্যাটে নতুন পুরুষ ভাড়াটিয়ার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক পুলিশ ভেরিফিকেশন চালু করা।
স্কুল পর্যায়ে সচেতনতা: প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সংক্রান্ত মনস্তাত্ত্বিক ও সচেতনতামূলক পাঠদান।
থানায় শিশু সুরক্ষা ডেস্ক: প্রতিটি থানায় নারী কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণে বিশেষ শিশু সুরক্ষা ডেস্ক নিশ্চিত করা।
মনোলোক-এর শেষ কথা:
আজকের সকালটি আর রামিসার বাবার জন্য এক জোড়া জুতো হাতে স্কুলে যাওয়ার আনন্দের নয়, আজ তার ঘরজুড়ে কেবলই শূন্যতা। সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে আজ একটাই জোরালো দাবি—আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সামাজিক নজরদারির মাধ্যমে এই পৈশাচিকতার ইতি টানা হোক। রামিসাই যেন হয় এই দেশের শেষ রামিসা।
Leave a Reply