
মনোলোক-এর বিশেষ প্রতিবেদন:
নেত্রকোনায় রোগী থেকে শিক্ষার্থী: ধলাই নদী পারাপারে সবার একমাত্র ভরসা ড্রামের বোট
সোহেল খান দূরজয়, নেত্রকোনা থেকে:
একটি মাত্র টেকসই সেতুর অভাব কীভাবে হাজার হাজার মানুষের জীবনযাত্রাকে থমকে দিতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের ধলাই নদী। স্বাধীনতার পর থেকে একের পর এক জনপ্রতিনিধিরা শুধু আশ্বাসের বাণীই শুনিয়ে গেছেন, কিন্তু বাস্তবে রূপ নেয়নি এলাকাবাসীর কাঙ্ক্ষিত সেই সেতু। ফলে আজিমপুর, জবাখালি, সাকরাজ, উত্তিয়ারকোণা, পাথরকাটা, সহিলদেওসহ প্রায় ২২টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষকে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে। বর্তমানে রোগী, শিক্ষার্থী, কৃষক ও কর্মজীবী মানুষের নদী পারাপারের একমাত্র ভরসা— প্লাস্টিকের ড্রাম আর কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো একটি নড়বড়ে বোট।
টানানো রশিই পারাপারের একমাত্র সম্বল
সরেজমিনে সমাজ সহিলদেও ইউনিয়নের পাথরকাটা ও মেদিপাথরকাটা গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ধলাই নদীতে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ চিত্র। কয়েকটি ড্রাম একত্র করে ওপরে কাঠের তক্তা বিছিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি ভেলা বা বোট। নদীর দুই পাড়ে টাঙানো রয়েছে একটি শক্ত দড়ি। সেই দড়ি হাত দিয়ে টেনে টেনে নদীর এপার-ওপারে যাতায়াত করছেন স্কুল-কলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ।
নদীর দুই পাড়েই রয়েছে খান বাহাদুর কবির উদ্দিন খান উচ্চ বিদ্যালয়, ২৯ নং সহিলদেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইউনিয়ন ভূমি অফিস, বাজার, ব্যাংক ও হাসপাতাল। ফলে প্রতিদিন শত শত মানুষকে বাধ্য হয়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করতে হয়।
বর্ষায় ডুবে যাওয়ার ভয়, শুষ্ক মৌসুমে ঠেকে যায় তলা
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষা মৌসুমে নদী যখন পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ থাকে, তখন ড্রামের বোটে পারাপার হতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হয় শিক্ষার্থীরা। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গেলে ড্রামের তলা মাটিতে ঠেকে যায়, ফলে বোট চালানোই দায় হয়ে পড়ে।
পাথরকাটা গ্রামের সাদেক মিয়া ও আলম মিয়াসহ একাধিক ভুক্তভোগী আক্ষেপ করে বলেন,
“নদীতে সেতু না থাকায় কৃষিপণ্য বা জরুরি মালামাল নিয়ে আমরা যাতায়াত করতে পারি না। সামান্য মালামাল পরিবহনের জন্য ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার রাস্তা ঘুরে যেতে হয়।”
কৃষক হাবিব মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অনেক দিন আগে একবার ইঞ্জিনিয়ার অফিসের লোকজন আইসা মাপ নিয়ে গেছিল। তা আর কত দিন মাপলে এই সেতুটি হবে আল্লাহ জানে।”
শিক্ষার্থীদের নিত্যদিনের আতঙ্ক
খান বাহাদুর কবির উদ্দিন খান উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী হাবিবা আক্তার এবং নবম শ্রেণির নাভা ও মিনার আক্তার জানায়, বর্ষাকালে প্রতিদিন আতঙ্কের মধ্য দিয়ে তাদের স্কুলে আসতে হয়। যেকোনো সময় বোট উল্টে বই-খাতা ভিজে যাওয়া বা বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম মৌলা বলেন, “সেতুটি নির্মাণ করা হলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যাতায়াত নিরাপদ হওয়ার পাশাপাশি এলাকার কৃষিজীবী মানুষ তাদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য পাবেন। কিছুদিন আগেই সেতুটির জন্য নতুন করে আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।”
আশ্বাসেই বন্দী প্রশাসন
সমাজ সহিলদেও ইউনিয়নের উপ-সহকারী কর্মকর্তা (ভূমি) খালেদ হোসেন জানান, সেতুটি নির্মিত হলে উভয় পাশের মানুষের যাতায়াত নিরাপদ ও সহজ হতো।
যোগাযোগ করা হলে মোহনগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী ইকরামুল হোসেন জানান,
“সেতু নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আমি নিজে একবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এসেছি। অনুমোদন পেলেই দ্রুত সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু করা হবে।”
নির্বাচন এলে প্রতিশ্রুতি আর ভোট ফুরালেই অবহেলা— এই চক্র থেকে মুক্তি চান ধলাই নদীর দুই পাড়ের মানুষ। ২২ গ্রামের বাসিন্দাদের এখন একটিই দাবি, দ্রুত ধলাই নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করে তাদের দীর্ঘদিনের এই মানবিক দুর্ভোগের অবসান ঘটানো হোক।
Leave a Reply