
মনোলোক-এর বিশেষ প্রতিবেদন
বিশেষ প্রতিনিধি, কাঠমান্ডু:
শেক্সপিয়রের ‘রোমিও-জুলিয়েট’ নাটকের ট্র্যাজেডির কথা আমরা সবাই জানি, যেখানে দুই তরুণ-তরুণীর প্রেমকে মেনে নেয়নি সমাজ। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে সেই রোমিও-জুলিয়েটের নামেই এক নতুন আইনি বিপ্লব ঘটতে চলেছে হিমালয়ের দেশ নেপালে। কিশোর-কিশোরীদের পারস্পরিক সম্মতির সম্পর্ককে ফৌজদারি অপরাধের হাত থেকে বাঁচাতে এক ঐতিহাসিক আইন সংশোধনের পথে হাঁটছে দেশটির সরকার। প্রস্তাবিত এই বিশেষ আইনটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘রোমিও-জুলিয়েট ক্লজ’ (Romeo-Juliet Clause)।
নেপালের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের নেতৃত্বাধীন সরকার বর্তমানে এই আইনটি পর্যালোচনার টেবিলে রেখেছে। বিষয়টি সামনে আসতেই দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা ও বিতর্ক।
কী এই ‘রোমিও-জুলিয়েট’ ধারা?
সহজ কথায়, এটি কিশোর-কিশোরীদের পারস্পরিক সম্মতির সম্পর্ককে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার একটি বিশেষ ধারা। নেপালের প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী:
বয়সের সীমা: যদি সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত দু’জনেরই বয়স ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে হয়, তবে তাদের পারস্পরিক সম্মতিকে রাষ্ট্র আইনি স্বীকৃতি দেবে।
বয়সের ব্যবধান: দু’জনের মধ্যে বয়সের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৩ বছর বা তার কম হতে হবে।
অপরাধমুক্ত ঘোষণা: এই শর্ত পূরণ হলে, তাদের মধ্যকার শারীরিক বা রোমান্টিক সম্পর্ককে আর ‘ধর্ষণ’ বা ‘যৌন নির্যাতন’ হিসেবে গণ্য করা হবে না।
তবে এখানে একটি বড় সতর্কতা রয়েছে— এই ধারা কোনোভাবেই ঢালাও শারীরিক সম্পর্কের ছাড়পত্র নয়। যদি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কোনো নাবালক বা নাবালিকার সাথে সম্পর্কে জড়ায়, কিংবা সম্পর্কে জোরজুলুম, ব্ল্যাকমেল, ক্ষমতার অপব্যবহার বা আর্থিক লেনদেনের (শোষণ) প্রমাণ মেলে, তবে তা আগের মতোই কঠোর শাস্তিমূলক অপরাধ বা ধর্ষণ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
কেন এই পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত?
নেপালের বর্তমান আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী যেকোনো কিশোর বা কিশোরীর মধ্যে শারীরিক সম্পর্ককে ‘স্ট্যাটিউটরি রেপ’ বা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়। সেখানে পারস্পরিক একশো ভাগ সম্মতি থাকলেও আইনের চোখে তার কোনো মূল্য ছিল না। পাশাপাশি নেপালে বৈধ বিয়ের বয়স ২০ বছর।
এর ফলে একটি বড় সামাজিক জটিলতা তৈরি হচ্ছিল। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সমবয়সী দুটি কিশোর-কিশোরী নিজেদের পছন্দে সম্পর্কে জড়ালে বা পালিয়ে গেলে, মেয়ের পরিবার তা মেনে না নিয়ে ছেলেটির বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা ঠুকে দিত। বিশেষ করে ভিন্ন জাতের (Inter-caste) প্রেমের ক্ষেত্রে আইনটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বহু কিশোরকে জেলে পাঠানো হচ্ছিল। এই কৃত্রিম আইনি জটিলতা ও যুবসমাজের বাস্তবতাকে অনুধাবন করেই আইন সংশোধন করতে চলেছে নেপালের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
এর পাশাপাশি নেপাল সরকার আইনি বিয়ের বয়সও ২০ থেকে কমিয়ে ১৮ বছরে আনার পরিকল্পনা করছে।
পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক এবং মনোস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন
নেপালের এই সাহসী পদক্ষেপ তরুণ সমাজ এবং প্রগতিশীল আইনজ্ঞদের মধ্যে তুমুল প্রশংসা কুড়ালেও, প্রাচীনপন্থী ও শিশু অধিকার কর্মীদের একাংশ এর তীব্র বিরোধিতা করছেন।
সমর্থকদের বক্তব্য: কাঠমান্ডুর যুব অধিকার কর্মী ও আইন পড়ুয়ারা বলছেন, “দুটি সমবয়সী কিশোর-কিশোরীর স্বাভাবিক আবেগ বা প্রেমকে অপরাধ হিসেবে দেখা বন্ধ করা উচিত। আইনটির লক্ষ্য ধর্ষণ আইনকে দুর্বল করা নয়, বরং স্বাভাবিক বয়ঃসন্ধিকালীন সম্পর্ককে অপরাধমূলক শোষণ থেকে আলাদা করা।”
বিরোধীদের শঙ্কা: সাবেক মানবাধিকার কর্মীদের মতে, নেপালে এখনো বাল্যবিয়ে এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে এই আইনটির অপব্যবহার হতে পারে এবং নাবালিকা মেয়েদের সুরক্ষা বলয় দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
শেষ কথা
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুসারেই নেপাল সরকার এই পরিবর্তনের খসড়া তৈরি করছে, যেখানে সমবয়সীদের সম্মতির বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আইনটি পাস হলে দক্ষিণ এশিয়ার রক্ষণশীল আইনি কাঠামোতে এটি একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে। আইন কেবল শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, বরং বাস্তব সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্বকে বুঝে সুরক্ষার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য—নেপালের ‘রোমিও-জুলিয়েট ধারা’ যেন সেই বার্তাই দিচ্ছে।
Leave a Reply