
মনোলোক / কোয়েটা, ২৪ মে ২০২৬: দক্ষিণ-পশ্চিম পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের রাজধানী কোয়েটায় নিরাপত্তা কর্মীদের বহনকারী একটি চলন্ত শাটল ট্রেনে ভয়াবহ আত্মঘাতী গাড়ি বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। আজ রোববার (২৪ মে) স্থানীয় সময় সকাল আনুমানিক ৮টা ৫ মিনিটে কোয়েটার সেনানিবাস (ক্যান্টনমেন্ট) এলাকা থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটি লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। রক্তক্ষয়ী এই বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ অন্তত ২৪ জন নিহত এবং ৮২ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
ঘটনার বিবরণ ও প্রাথমিক তদন্ত
পুলিশ ও স্থানীয় গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বহনকারী ট্রেনটি কোয়েটা স্টেশন ছাড়ার কিছুক্ষণ পরই ‘চমন ফটক’ রেলক্রসিংয়ের কাছে এই হামলার শিকার হয়। প্রাথমিক তদন্তে নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, এটি একটি আত্মঘাতী বোমা হামলা ছিল।
অনুমান করা হচ্ছে, বিস্ফোরক ভর্তি একটি গাড়ি নিয়ে এক আত্মঘাতী হামলাকারী সরাসরি চলন্ত ট্রেনের একটি বগিতে ধাক্কা মারে। প্রাথমিক ফরেনসিক রিপোর্টে জানা গেছে, হামলায় ব্যবহৃত গাড়িটিতে প্রায় ৭০ কেজি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক মজুত ছিল। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, তা কয়েক মাইল দূর থেকেও শোনা যায়।
ক্ষয়ক্ষতি ও উদ্ধার অভিযান
বিস্ফোরণের প্রচণ্ড আঘাতে ট্রেনের ইঞ্জিনসহ বেশ কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে এবং অন্তত দুটি বগিতে তাৎক্ষণিকভাবে দাউদাউ করে আগুন ধরে যায়।
প্রাণহানি ও জখম: এখন পর্যন্ত ২৪ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ফ্রন্টিয়ার কোরের (FC) সদস্য রয়েছেন। এছাড়া আহত ৮২ জনের মধ্যে অনেকেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পার্শ্ববর্তী এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি: রেললাইনের একদম কাছে অবস্থিত একটি আবাসিক এলাকার পাশে বিস্ফোরণটি ঘটায় আশেপাশের বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ও বহুতল ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া কাছাকাছি পার্ক করে রাখা অন্তত ১০টি গাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
ঘটনার পরপরই কোয়েটার সিভিল হাসপাতাল এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (CMH) জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। ছুটিতে থাকা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্রুত কর্মস্থলে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবীরা সামরিক বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জ্বলন্ত ট্রেন ও ধ্বংসস্তূপ থেকে হতাহতদের উদ্ধারে অংশ নেন।
দায় স্বীকার ও প্রতিক্রিয়া
বিস্ফোরণের কিছুক্ষণের মধ্যেই এই হামলার দায় স্বীকার করেছে ওই অঞ্চলে সক্রিয় নিষিদ্ধ ঘোষিত সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচ লিবারেশন আর্মি (BLA)। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তারা দাবি করে, তাদের একজন আত্মঘাতী বোমারু সামরিক কর্মীদের লক্ষ্য করে এই হামলাটি চালিয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতি এই কাপুরুষোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেন:
“সন্ত্রাসীদের এই ধরনের জঘন্য ও বর্বরোচিত কর্মকাণ্ড পাকিস্তানের জনগণের সংকল্পকে দুর্বল করতে পারবে না। অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে।”
খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ বেলুচিস্তানে গত কয়েক মাস ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর সহিংস তৎপরতা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পুরো এলাকা জুড়ে বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে।
Leave a Reply