ট্রাম্পের ‘বিজয় উল্লাস’ বনাম তেহরানের ‘লাল রেখা’: ইরান-ইউএস কূটনীতিতে গভীর ধাপ্পাবাজির নেপথ্যে
-
Update Time :
শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬
-
২১
Time View

মনোলোক এক্সক্লুসিভ / সর্বশেষ আপডেট :
ট্রাম্পের ‘বিজয় উল্লাস’ বনাম তেহরানের ‘লাল রেখা’: ইরান-ইউএস কূটনীতিতে গভীর ধাপ্পাবাজির নেপথ্যে
কূটনৈতিক ডেস্ক, মনোলোক:
কল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যকার পার্থক্য কোনো সাধারণ কূটনৈতিক ভুল বোঝাবুঝি নয়, বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিজয়সূচক দাবির অন্তরে লুকিয়ে থাকা এক গভীর ব্যর্থতার লক্ষণ। ৩ মাস ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের পর যখন একটি সম্ভাব্য ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই ট্রাম্পের একতরফা ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য পরিস্থিতিকে নতুন করে ঘোলাটে করে তুলেছে। হোয়াইট হাউস থেকে প্রচার করা এই ‘চূড়ান্ত বিজয়ের’ গল্পকে তেহরান সম্পূর্ণ ‘ধাপ্পাবাজি’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আলোচনার টেবিলে চোদ্দটি প্রস্তাব এবং তেহরানের অনড় অবস্থান
ইরানের গণমাধ্যম পার্সটুডে এবং আইআরজিসির (IRGC) ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ১৪টি প্রস্তাবের চূড়ান্ত খসড়া ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জমা দেয়নি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দর কষাকষির মূলনীতি হলো—“সবকিছুতে একমত না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছুতেই একমত হওয়া যায় না।”
হোয়াইট হাউস তড়িঘড়ি করে এটিকে মার্কিন কূটনীতির সাফল্য হিসেবে দাবি করলেও, তেহরানের দৃষ্টিকোণ থেকে এর কোনোটিই চূড়ান্ত নয়।
পুরোনো তাস বনাম দুই দশকের পরমাণু নীতি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন না করার অঙ্গীকারকে তার মেয়াদের একটি বড় তুরুপের তাস ও নতুন সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দাবিটি ইরানের দুই দশকের পারমাণবিক কূটনীতির মতোই পুরোনো।
তেহরান বরাবরই বলে আসছে তারা পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে চায় না।
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতার ঐতিহাসিক ধর্মীয় ফতোয়া অনুযায়ীও গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ফলে, ট্রাম্প যেটিকে ইরানের ‘পশ্চাদপসরণ’ বা মার্কিন চাপের মুখে ‘নতুন ছাড়’ বলে চালাচ্ছেন, তা আসলে ইরানের দীর্ঘদিনের পুরোনো নীতিরই পুনরাবৃত্তি।
হরমুজ প্রণালী: ‘যুদ্ধ-পূর্ববর্তী’ অবস্থায় ফেরার অলীক স্বপ্ন
ট্রাম্পের দাবির সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি প্রকাশ পেয়েছে হরমুজ প্রণালী ও ইরানের সামুদ্রিক সীমানা নিয়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন যে, হরমুজ প্রণালীকে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে এবং কথিত মাইনগুলো মার্কিন বাহিনী নিষ্ক্রিয় করেছে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন:
ইরানের স্পষ্ট বার্তা:
“হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি যুদ্ধের আগের অবস্থায় আর কখনোই ফিরবে না।”
সার্বভৌমত্ব ও অবরোধের শর্ত: ব্যাপক সামরিক চাপ সত্ত্বেও এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে ইরানের সার্বভৌমত্ব খর্ব করা যায়নি। ইরান সাফ জানিয়েছে, যতক্ষণ না তাদের জাহাজের ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ কার্যকরভাবে তুলে নেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ তারা হরমুজ প্রণালীতে তাদের কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা পরিবর্তন করবে না।
মাইনের ধোঁয়াশা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি: ইরান এই জলপথে কখনোই মাইনের অস্তিত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। যেখানে মার্কিন নৌবহর অনুমতি ছাড়া এই প্রণালীতে প্রবেশই করতে পারছে না, সেখানে মাইন অপসারণের দাবিটি মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ফায়দা তোলার একটি সস্তা চাল মাত্র।
ইউরেনিয়াম মজুদ: ওয়াশিংটনের গোপন পিছুটান?
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভাগ্য নির্ধারণ নিয়ে ট্রাম্পের দাবিও সম্পূর্ণ কল্পিত। তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের তরলীকরণ বা সংরক্ষণের বিষয়টি সম্পূর্ণ তাদের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
তবে এই ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সুর কিছুটা নরম হতে দেখা গেছে। ট্রাম্প এখন আর সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অন্য কোনো তৃতীয় দেশে (যেমন রাশিয়া বা চীন) হস্তান্তর করার জন্য জোরাজুরি করছেন না। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মার্কিন প্রশাসনের একটি গোপন পিছুটানের আলামত, যার ফলে এই সুনির্দিষ্ট বিতর্কটি আপাতত থিতু হয়েছে।
মনোলোক মূল্যায়ন:
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুঙ্কার ও একতরফা খসড়া প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য ঘরোয়া রাজনীতিতে নিজের ইমেজ ধরে রাখা। কিন্তু তেহরানের ‘রেড লাইন’ বা মর্যাদার লাল রেখাগুলো অপরিবর্তিত থাকায় এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পাশাপাশি ১২ বিলিয়ন ডলারের হিমায়িত তহবিল অবমুক্ত করার মতো ইরানের প্রাথমিক শর্তগুলো পূরণ না হওয়ায়, কূটনীতির পথ এখনো অত্যন্ত দুর্গম রয়ে গেছে।
Like this:
Like Loading...
Related
Please Share This Post in Your Social Media
More News Of This Category
Leave a Reply