
দেশের বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা অব্যবহৃত খাল-বিল ও জলাশয় সংস্কার করে স্থানীয় তরুণদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এসব জলাশয়ে সরকারি উদ্যোগে মাছের পোনা অবমুক্ত করার পাশাপাশি তরুণদের মাছ চাষে সম্পৃক্ত করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে।
একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড গঠনের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ ফান্ড থেকে সম্ভাবনাময় নতুন উদ্যোক্তাদের ৫ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, এই অর্থ ঋণ নয়, এটি গ্রান্ট বা অনুদান।
রোববার (১৬ আগস্ট) কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে ‘জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এবং জাতীয় মৎস্য পুরস্কার-২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় পড়ে থাকা অব্যবহৃত জলাশয়গুলো চিহ্নিত করে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংস্কারের পর সরকারের পক্ষ থেকে সেখানে মাছের পোনা ছাড়া হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট এলাকার তরুণদের মধ্যে জলাশয়গুলো যথাযথভাবে বরাদ্দ দেওয়া হবে, যাতে তারা মাছ চাষের মাধ্যমে নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন।
তিনি বলেন, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড গঠন করা হয়েছে। এই ফান্ড থেকে সম্ভাবনাময় নতুন উদ্যোক্তারা ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুদান পাবেন। এটি কোনো ঋণ নয়, সম্পূর্ণ গ্রান্ট। নতুন উদ্যোক্তাদের এ সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
মৎস্য খাতের অগ্রগতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্বের ৫২টি দেশে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে।
গত জুনে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রকাশিত প্রতিবেদনের উল্লেখ করে তিনি বলেন, জলজ প্রাণী উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম এবং অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে মাছ আহরণে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, খুলনায় ৩০০টি ক্লাস্টার গঠনের মাধ্যমে চিংড়ির উৎপাদন দ্বিগুণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কক্সবাজারের চকরিয়ায় প্রায় ৭ হাজার একর জমিতে ‘শ্রিম্প সিটি মাস্টার প্ল্যান’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে জিআই পণ্য ইলিশের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ এবং এটি জিডিপিতে ১ শতাংশের বেশি অবদান রাখছে।
তিনি বলেন, ২০০৩-০৪ সালে বিএনপি সরকারের সময় নেওয়া ‘ইলসা ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান’-এর ধারাবাহিকতায় ইলিশের উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
মৎস্যচাষি ও জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল।
মৎস্যচাষিদের কৃষক কার্ডের আওতায় আনার পাশাপাশি জেলেদের পরিচয়পত্র প্রদান ও নিবন্ধনের কার্যক্রম চলছে বলেও জানান তিনি।
এছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো সুন্দরবন ও হাওর অঞ্চলে মাছ ধরার নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের ভিজিএফ সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে। নতুন বাজার অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গত জুনে প্রথমবারের মতো নাইজেরিয়ায় হ্যাচিং ডিম রপ্তানি করা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
জলাশয় দূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের ফেলে দেওয়া আবর্জনা, টিস্যু পেপার ও প্লাস্টিকের বোতল জলাশয়ের পরিবেশ নষ্ট করছে। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী রক্ষা করতে হলে জলাশয় ও পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে।
তিনি বলেন, সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে আগামী প্রজন্মের পাশাপাশি দেশের প্রাণিসম্পদ ও জলজ সম্পদও সুরক্ষিত থাকবে।
‘রুপালী মৎস্য স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এবারের জাতীয় মৎস্য পক্ষের এ প্রতিপাদ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে কাজে লাগিয়ে পুষ্টিসমৃদ্ধ, আত্মনির্ভরশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
পরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬’-এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
Leave a Reply