
মনোলোক / ২ জুন, ২০২৬ : মোঃ আরিফুজ্জামান আরিফ, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) : বিশ্ব ঐতিহ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক প্রাচীর সুন্দরবনে গতকাল (সোমবার) থেকে তিন মাসের জন্য সর্বসাধারণের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১ জুন থেকে শুরু হওয়া এই নিষেধাজ্ঞা আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বনের প্রাকৃতিক সম্পদ, মৎস্য ও জলজ প্রাণীর নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বন্য প্রাণীর সুরক্ষার লক্ষ্যেই প্রতিবছরের মতো এবারও এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সব ধরনের মাছ ও কাঁকড়া আহরণ, মধু সংগ্রহ এবং পর্যটকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
দুশ্চিন্তা ও সংকটে লক্ষাধিক বনজীবী: বন বিভাগের এই দূরদর্শী ও পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্তে বনের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর জন্য ইতিবাচক হলেও চরম দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন সুন্দরবন-নির্ভর হাজার হাজার জেলে, মৌয়াল ও বনজীবী পরিবার। শ্যামনগরসহ সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই বনের ওপর নির্ভরশীল। আচমকা তিন মাসের জন্য উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে দিনাতিপাত করবেন, তা নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।
স্থানীয় বনজীবীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বছরের এই তিন মাস তাদের চরম দুশ্চিন্তায় কাটাতে হয়। আয়-রোজগারের বিকল্প কোনো উৎস না থাকায় অনেকেই এই সময়ে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন। দাদন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে নেওয়া এই ধারদেনার জাল কাটতে তাদের বছরের বাকি সময়টা পার হয়ে যায়। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচনের ধারা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ভুক্তভোগী জেলেদের আকুতি: “নিষেধাজ্ঞার এই দীর্ঘ সময়ে আমরা সরকারিভাবে পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা বা কোনো বিশেষ প্রণোদনা পাই না।

সুন্দরবনে তিন মাস পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা: চরম অনিশ্চয়তায় হাজারো জেলে পরিবার
ফলে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকার মতো অবস্থা তৈরি হয়। বনের সুরক্ষার জন্য নিষেধাজ্ঞা যেমন প্রয়োজন, তেমনি আমাদের টিকে থাকার জন্য বিশেষ পুনর্বাসন বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সরকারের দায়িত্ব।”
প্রকৃতির পুনর্জন্ম ও প্রজনন মৌসুম: এ বিষয়ে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাস সুন্দরবনের মাছ, জলজ প্রাণী এবং বিভিন্ন বন্য প্রাণীর প্রধান প্রজনন মৌসুম। এই সময়ে বনের নদী ও খালে থাকা অধিকাংশ মাছ ডিম ছাড়ে। একই সাথে বনের উদ্ভিদরাজির স্বাভাবিক পুনর্জন্ম ও বৃদ্ধি প্রক্রিয়া এই সময়েই সবচেয়ে বেশি কার্যকর থাকে। মানুষের অবাধ যাতায়াত এবং কোলাহল বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বংশবিস্তারে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটায়। তাই বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এই সাময়িক ত্যাগ স্বীকার করা অপরিহার্য।
নিষেধাজ্ঞা সফলভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সুন্দরবন সংলগ্ন স্টেশন ও ক্যাম্পগুলোতে security জোরদার করা হয়েছে। জেলে, মৌয়াল ও পর্যটকদের জন্য নতুন পাস (অনুমতিপত্র) দেওয়া ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ১ জুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগেই বনের অভ্যন্তরে থাকা সকল বনজীবী ও পর্যটকদের বন এলাকা ত্যাগের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
মানবিক সহায়তার জোরালো দাবি: উপকূলীয় এলাকার সুশীল সমাজ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, সুন্দরবনের সুরক্ষায় বন বিভাগের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও, এর ফলে কর্মহীন হয়ে পড়া লাখো বনজীবীর মানবিক সংকটটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই এই নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন ক্ষতিগ্রস্ত জেলে ও মৌয়াল পরিবারগুলোকে বিশেষ রেশনিং ব্যবস্থার আওতায় এনে পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা এবং সহজ শর্তে সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
Leave a Reply