
ভিন্ন মাত্রার বউ: কল্পনা বনাম বার্ধক্যের ধূসর বাস্তবতা
— মাইনুল ইসলাম মিসির
যৌবনের দিনগুলোতে মানুষের মন এক অদ্ভুত মায়াজাল বুনে চলে। মনের ক্যানভাসে তখন ভেসে ওঠে কতশত রূপালী ছবি। কেউ কোনোদিন ভয়ঙ্করদর্শন কোনো অবয়বের কল্পনা করে না; অবচেতন মনজুড়ে কেবলই রাজত্ব করে এক পরম ভালো লাগার অনুভূতি। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কৈশোর আর তারুণ্যের সেই সোনালী দিনগুলোতে আমার মন জুড়ে ছিলেন একজনই— বলিউড ডিভা মাধুরী দীক্ষিত। আহা, কী সেই ভুবনভুলানো হাসি! কী এক সম্মোহনী ও মুগ্ধতায় ভরা চোখ! সব মিলিয়ে মাধুরীই যেন হয়ে উঠেছিলেন কল্পনার সেই আদর্শ নারী, যার প্রতিচ্ছবি আমরা অবান্তরের মাঝেও খুঁজে বেড়াই।
কিন্তু মানুষের জীবনের নির্মম সত্য হলো— “মানুষ ভাবে এক, আর হয় আরেক।”
বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যখন জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ বার্ধক্যের দোরগোড়ায় এসে ঠেকেছি, তখন পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই কল্পনার দিনগুলোই বোধহয় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও মুগ্ধকর সময় ছিল। কারণ, বিবাহিত জীবনের বাস্তব ‘বউ’ যেন এক সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা নিয়ে হাজির হয়। সেখানে আকাশছোঁয়া ভালোবাসার রোমান্টিকতা তো দূর, উল্টো সময়ের আবর্তে জীবনের সব উচ্ছ্বাস ম্লান হয়ে আসে।
সময়ের সাথে সাথে মানুষের শরীর বদলায়, মনস্তত্ত্ব বদলায়। বিশেষ করে একটা বয়সে এসে নারীদের শারীরিক ও মানসিক চাহিদা যখন ক্রমশ শূন্যের কোঠায় নেমে আসে, ঠিক তখনই যেন পুরুষ তার মনের সুপ্ত আবেগ আর যৌবনের শেষ উচ্ছ্বাসটুকু প্রকাশ করতে চায়। আর এই বিপরীতমুখী মানসিকতার কারণেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব। জীবনসঙ্গী তখন আর সেই চিরচেনা রূপসী মায়াবিনী থাকে না; বরং খিটখিটে মেজাজ, চরম অনীহা আর পদে পদে এক বুক সন্দেহ নিয়ে বৃদ্ধ স্বামীকে দেখতে শুরু করে। প্রতিটি পদক্ষেপে অসম্মান আর অবিশ্বাস যেন হয়ে ওঠে এক রূঢ় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।
আর এই মানসিক দূরত্বের কারণেই আজ আমাদের সমাজব্যবস্থা এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। ঘরে ঘরে ভাঙছে সংসার, জ্যামিতিক হারে বাড়ছে ডিভোর্স বা তালাকের সংখ্যা। ভালোবাসার পবিত্র বন্ধন আজ যেন হারিয়ে যাচ্ছে। তার জায়গা দখল করে নিচ্ছে লিভ-টু-গেদার, পরকীয়া, অবৈধ সন্তান এবং ভ্রূণহত্যার মতো সামাজিক ব্যাধি, যা আমাদের চারপাশের নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজকাল অনেক ক্ষেত্রেই নিখাদ ভালোবাসার চেয়ে টাকার মোহ আর লোভ নারীদের অন্ধ করে দিচ্ছে। তারা সংসার জীবনের ত্যাগ ও মর্যাদা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। স্বামীকে সমাজে ছোট করা, হেয় প্রতিপন্ন করা বা লোকসমক্ষে তার বদনাম করে নিজেকে ওপরে তুলে ধরার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমরা দেখছি। সত্য ও সঠিক নিয়মে একটি সুন্দর সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য যে উদার মনের প্রয়োজন, আজ যেন তার বড় বেশি অভাব।
তবুও, এই ভাঙাগড়ার মাঝেই বেঁচে থাকার আকুতি নিয়ে আমাদের প্রতিদিনের সংসার-যুদ্ধ চলে। আর এই যুদ্ধ করতে করতেই কখন যে অলক্ষ্যে জীবনের আয়ু ফুরিয়ে আসে, আমরা নিজেরাও টের পাই না।
©️®️ মনোলোক (www.monolok.net)
Leave a Reply