
ক্রীড়া প্রতিবেদক, মনোলোক ৩ জুন, ২০২৬ : গোয়া, ভারত: ম্যাচের প্রথম আধঘণ্টা ডাগআউটে বসা কোচ পিটার বাটলারের কপালের ভাঁজ যত চওড়া হচ্ছিল, গ্যালারিতে থাকা লাল-সবুজের সমর্থকদের বুকের ধড়ফড়ানি বাড়ছিল ঠিক ততটাই। টানা তৃতীয় শিরোপার মিশনে নামা একটা দলের শুরুটা এতটা ছন্নছাড়া, এতটা বিবর্ণ হতে পারে—তা হয়তো ম্যাচ শুরুর আগে কেউ ভাবেনি। মাঝমাঠের সমন্বয়হীনতা আর একের পর এক ভুল পাসে মনে হচ্ছিল, দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট বুঝি এবার হাতছাড়া হতে চলেছে।
কিন্তু ফুটবল শুধু পায়ের খেলা নয়, স্নায়ুরও লড়াই। আর সেই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে দুর্দান্ত এক রূপকথা লিখে নেপালকে ২–১ গোলে হারিয়ে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠে গেল বাংলাদেশ। গোয়ার মারগাঁওয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে এই জয়ের মধ্য দিয়ে ঋতুপর্ণা-আফঈদারা প্রমাণ করলেন, বাঘিনীদের ডিকশনারিতে ‘হাল ছেড়ে দেওয়া’ বলে কোনো শব্দ নেই।
নেপালের চড়া আক্রমণ ও প্রথমার্ধের মনস্তাত্ত্বিক চাপ
ম্যাচের শুরু থেকেই চড়াও হয়ে খেলতে থাকে নেপাল। বল দখল আর মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশকে পাত্তাই দিচ্ছিল না তারা। ম্যাচের ২৩ মিনিটেই সেই চাপের ফল পায় নেপাল। দীপা শাহির নিখুঁত কর্নার কিক থেকে আসা বলে আলতো পায়ের টোকায় গোল করে নেপালকে এগিয়ে নেন গীতা রানা।
১–০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর বাংলাদেশের খেলায় এক ধরনের তাড়াহুড়ো এবং স্নায়ুবিক চাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমার্ধের বাকিটা সময় লাল-সবুজ শিবিরকে মূলত নিজেদের রক্ষণভাগ সামলাতেই ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়।
ম্যাচের মোড় ঘোরানো ঋতুপর্ণার ‘অলিম্পিক গোল’
যখন মনে হচ্ছিল ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেই বিরতিতে যাবে বাংলাদেশ, ঠিক তখনই যোগ করা সময়ে (ইঞ্জুরি টাইম) ঘটে ম্যাচের সবচেয়ে ম্যাজিকাল মুহূর্তটি। কর্নার কিক থেকে সরাসরি নেপালের জালে বল জড়িয়ে দেন ঋতুপর্ণা চাকমা। ফুটবল ইতিহাসে যাকে বলা হয় ‘অলিম্পিক গোল’।
বিরতির ঠিক আগমুহূর্তের এই গোলটি কেবল স্কোরলাইনে ১–১ সমতাই আনেনি, বরং ম্যাচের পুরো মনস্তাত্ত্বিক মোড় বাংলাদেশের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। ড্রেসিংরুমে যাওয়ার সময় নেপালি শিবিরের চেহারায় ভর করে হতাশা, আর বাংলাদেশের চোখে ফেরে আত্মবিশ্বাস।
দ্বিতীয়ার্ধের নাটক ও গোলপোস্টের নিচে মিলির দেয়াল
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে আবারও খেই হারিয়েছিল বাংলাদেশের ডিফেন্স। নেপালি ফরোয়ার্ড রেখা বাংলাদেশের গোলকিপারকে একা পেয়ে কাটিয়ে শট নিলেও বল পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ভাগ্যদেবীর সহায়তায় সে যাত্রা বেঁচে যায় বাংলাদেশ।
এরপরের গল্পটা শুধুই বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিলির বীরত্বের। ম্যাচের ৬৯ মিনিটে নেপালের সারু লিম্বুর একটি বিপজ্জনক বাঁকানো শটসহ একাধিক নিশ্চিত গোল রুখে দিয়ে মিলি একাই বাংলাদেশকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন।
৭৮ মিনিটে অবশ্য এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। শামসুন্নাহার জুনিয়রের চমৎকার পাস থেকে বল পেয়ে নেপালের বক্সের ভেতর থেকে শট নিয়েছিলেন সাগরিকা। কিন্তু নেপালি গোলরক্ষকের ক্ষিপ্রতায় সে যাত্রায় গোল মেলেনি।
শেষ মিনিটের রোমাঞ্চ ও সাগরিকার জয়সূচক গোল
নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা যখন ১–১ সমতায় শেষ হয়, তখন সবাই ধরেই নিয়েছিল ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়াচ্ছে। কিন্তু নাটকের তখনও শেষ অঙ্ক বাকি ছিল।
যোগ করা ৬ মিনিটের একেবারে শেষ লগ্নে, যখন রেফারি বাঁশিতে ফুঁ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক তখন এক চমৎকার দলীয় আক্রমণে নেপালের রক্ষণব্যুহ ভেঙে বল জালে জড়ান তরুণ স্ট্রাইকার সাগরিকা। গোলের সাথে সাথেই উল্লাসে ফেটে পড়ে বাংলাদেশের পুরো ডাগআউট। আর নেপালের খেলোয়াড়রা কান্নায় ভেঙে পড়েন মাঠেই।
এক নজরে ম্যাচের পরিসংখ্যান:
বিবরণ
বাংলাদেশ
নেপাল
ফলাফল
২
১
গোলদাতা
ঋতুপর্ণা চাকমা (৪৫+’), সাগরিকা (৯০+’)
গীতা রানা (২৩’)
ম্যাচের সেরা টার্নিং পয়েন্ট
ঋতুপর্ণার সরাসরি কর্নার থেকে গোল
রেখার শট পোস্টে লাগা (নেপাল)
ফাইনাল নিশ্চিত
হ্যাঁ (টানা ৩য় বার)
বিদায়
ছন্নছাড়া ফুটবল খেলেও কেবল মানসিক দৃঢ়তা, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতার কারণে আজ জয়ী দলের নাম বাংলাদেশ। নেপালকে বিদায় করে ফাইনালে ওঠার পর এখন মেয়েদের সামনে লক্ষ্য একটাই—দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটটি অক্ষুণ্ণ রাখা।
© মনোলোক ক্রীড়া বিভাগ, ২০২৬
Leave a Reply