
মনোলোক ডেস্ক: রাজশাহীর গোদাগাড়ী মডেল থানায় কোনো লাশ বহনকারী গাড়ি না থাকায় চরম মানবিক বিপর্যয় ও ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ, ভুক্তভোগী পরিবার এবং স্বয়ং পুলিশ প্রশাসন। চাপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহী মহাসড়কের কারণে গোদাগাড়ী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে এবং বহু মানুষ প্রাণ হারান। কিন্তু দুর্ঘটনা বা আইনি প্রক্রিয়ায় মরদেহ উদ্ধার করা হলেও তা স্থানান্তরের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে স্বজনদের। এই তীব্র সংকট নিরসনে ও মানবিক দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর তথা রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের জরুরি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গোদাগাড়ী একটি বিস্তীর্ণ ও সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। বিশেষ করে চাপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহী মহাসড়কটি এই উপজেলার ওপর দিয়ে যাওয়ায় এবং অতিরিক্ত গতি ও অসচেতনতার কারণে গোদাগাড়ীর বিভিন্ন স্থানে প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা লেগেই থাকে।
এসব দুর্ঘটনায় প্রায়ই ঘটনাস্থলে বা হাসপাতালে নেওয়ার পথে মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু থানায় কোনো নির্দিষ্ট লাশবাহী গাড়ি বা ফ্রিজার ভ্যান ও লাশ রাখার জায়গা না থাকায় বিপাকে পড়তে হয় সংশ্লিষ্ট সবাইকে। সাধারণ যানবাহন বা অ্যাম্বুলেন্স চালকরা অনেক সময় লাশ বহন করতে চান না। দীর্ঘ সময় ঘুরেও গাড়ি না পেয়ে একদিকে যেমন স্বজনদের অপেক্ষা ও আহাজারি দীর্ঘায়িত হয়, অন্যদিকে আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে লাশ মর্গে পাঠাতে পুলিশ প্রশাসনকেও চরম বেগ পেতে হয়।
সংলগ্ন চিত্রে দেখা যাচ্ছে, মহাসড়কের পাশে নিজস্ব কোনো উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ ট্রাকে করে অত্যন্ত অমানবিক ও কষ্টদায়ক উপায়ে মরদেহ পরিবহন করতে হচ্ছে এবং স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে জানান, মহাসড়কে দুর্ঘটনায় স্বজন হারানোর পর থানায় লাশ নিয়ে আসার পর বা তা মর্গে পাঠানোর সময় গাড়ির জন্য যে হাহাকার তৈরি হয়, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অনেক গাড়ি চালক লাশ তুলতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া দিয়েও সময়মতো গাড়ি জোগাড় করা যায় না। একটি মডেল থানায় এই ধরনের সেবার অভাব অনাকাঙ্ক্ষিত।
বাস্তব সংকট ও আইনি জটিলতা নিয়ে যা বললেন ওসি মোঃ আতিকুর রহমান:
থানায় নিজস্ব লাশবাহী গাড়ি বা লাশ রাখার নির্দিষ্ট কোনো জায়গা না থাকার কারণে মাঠপর্যায়ের বাস্তব সংকটের কথা স্বীকার করেছেন গোদাগাড়ী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ আতিকুর রহমান। এই সংকটের কারণে পুলিশকে কী কী সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, সে বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, “গোদাগাড়ী থানা এলাকাটি বেশ বড় এবং এর ওপর দিয়ে চাপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহী মহাসড়ক চলে গেছে, যার কারণে এখানে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। থানায় নিজস্ব কোনো লাশবাহী গাড়ি বা ফ্রিজার ভ্যান না থাকায় প্রথম এবং প্রধান সমস্যা হয় মৃতদেহের সুরক্ষায়। অনেক সময় দুর্ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে থানায় আনার পর ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিংবা স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত লাশটি নিরাপদে ও মর্যাদার সাথে রাখার কোনো সুযোগ থাকে না।”

গোদাগাড়ী মডেল থানায় নেই লাশবাহী গাড়ি: মহাসড়কে প্রতিনিয়ত ঝরছে প্রাণ, চরম ভোগান্তিতে ভুক্তভোগী ও পুলিশ
তিনি আরও বলেন, “গরমের দিনে বা রাতে দীর্ঘক্ষণ লাশ পড়ে থাকলে তা বিকৃত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা অত্যন্ত অমানবিক। এছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে গাড়ি না পাওয়ায় দুর্ঘটনাস্থলে দীর্ঘক্ষণ লাশ পড়ে থাকলে মহাসড়কে যানজট তৈরি হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করাও আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।”
বাইরে থেকে বেসরকারি গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্স ম্যানেজ করতে গিয়ে চালকদের অস্বীকৃতির কারণে আইনি প্রক্রিয়া কতটা ব্যাহত হয়—এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, “বাইরে থেকে যখন আমাদের বেসরকারি গাড়ি বা সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সের ওপর নির্ভর করতে হয়, তখন আমরা চরম administrative ও আইনি জটিলতায় পড়ি। অধিকাংশ সাধারণ চালক বা অ্যাম্বুলেন্স মালিক তাদের গাড়িতে দুর্ঘটনার শিকার রক্তাক্ত বা ক্ষতবিক্ষত লাশ তুলতে চান না। তারা নানা অজুহাতে অস্বীকৃতি জানান বা কালক্ষেপণ করেন। এর ফলে লাশের প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি এবং ময়নাতদন্তের (Autopsy) জন্য দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর যে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। একটি গাড়ি ম্যানেজ করতেই যদি ৩-৪ ঘণ্টা পার হয়ে যায়, তবে আইনি প্রক্রিয়া যেমন ঝুলে যায়, তেমনি মর্গে পৌঁছাতে দেরি থাকায় ময়নাতদন্তের মেডিকেল রিপোর্টেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, এই বিলম্বের কারণে নিহত ব্যক্তির শোকার্ত স্বজনদের থানায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, যা তাদের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়।”
সমস্যার সমাধান প্রসঙ্গে তিনি জানান, “আমরা স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধিদের সাথেও বিভিন্ন সময়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করবো। আমরা আশা করছি, এই জনগুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়টি বিবেচনা করে স্থানীয় পর্যায় থেকে যদি দ্রুত কোনো বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে একটি লাশবাহী ভ্যানের ব্যবস্থা করা যায়, তবে পুলিশ এবং সাধারণ জনগণ উভয়েই এই বড় ভোগান্তি থেকে রেহাই পাবে।”
সচেতন মহলের দুঃখ প্রকাশ ও দৃষ্টি আকর্ষণ:
এ বিষয়ে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। তারা বলছেন, চাপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহী মহাসড়কের এই মৃত্যুফাঁদে পড়ে যারা প্রাণ হারাচ্ছেন, তাদের শেষ বিদায়ের মুহূর্তটিকে অন্তত ভোগান্তিমুক্ত ও সম্মানজনক করা উচিত।
এলাকার সচেতন নাগরিক সমাজ ও সর্বস্তরের ভুক্তভোগীরা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের সু-দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জনগুরুত্বপূর্ণ। তিনি যদি বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে দলীয়, প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে গোদাগাড়ী মডেল থানায় একটি স্থায়ী লাশ বহনকারী গাড়ির ব্যবস্থা করে দেওয়ার উদ্যোগ নেন, তবে এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের একটি বড় কষ্টের অবসান ঘটবে।
সংবাদ ও প্রতিবেদন: মোঃ রবিউল ইসলাম মিনাল, রাজশাহী, গোদাগাড়ী।
Leave a Reply