
মনোলোক ডেস্ক: “এর চেয়ে আমাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলেন! আমি সামান্য চাকরি করে খাই, বারবার মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। আমি এত টাকা কোথায় পাবো?”
আদালতের নিস্তব্ধতা ভেঙে কাঠগড়া থেকে ভেসে আসা এই বুকফাটা আর্তনাদ আর অশ্রুসিক্ত চোখগুলো উপস্থিত সবাইকে স্তম্ভিত করে দেয়। কথাগুলো বলছিলেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের একসময়ের কুখ্যাত ও শীর্ষ সন্ত্রাসী, ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের প্রধান সুব্রত বাইনের মেয়ে খাদিজা ইয়াসমিন বিথী (৩৫)।
শনিবার (২৩ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করার পর বিচারক মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বৈষম্যবিরোধী জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকায় সোহেলী তামান্না নামের এক নারীকে হত্যাচেষ্টা মামলায় তাকে নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
বিথীর এই আহাজারি কি শুধুই নিজেকে বাঁচানোর আবেগঘন চেষ্টা, নাকি স্রেফ বাবার পরিচয়ের কারণে তিনি বারবার রাজনৈতিক আবর্তে বলির পাঁঠা হচ্ছেন— এই প্রশ্নটি এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সচেতন মহলে।
আদালতে বিথীর বিস্ফোরক দাবি: “বাবার পরিচয়ে কেন ভুগব?”
আদালতের অনুমতি নিয়ে নিজের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে বিথী নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেন। রাজনীতির সাথে তার দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি ছাত্রলীগ বা যুবলীগের সাথে জড়িত থাকবো কীভাবে? শুধুমাত্র বাবার কারণে আমাকে একের পর এক সাজানো মামলায় জড়ানো হচ্ছে। আমার ১৩ বছরের একটা ছোট মেয়ে আছে। আমি তো শুধু কুমিল্লা কারাগারে আমার বাবাকে দেখতে গিয়েছিলাম, আর সেখান থেকেই আমাকে (গত বছরের ডিসেম্বরে) ধরে আনা হলো! সন্তান হিসেবে বাবাকে দেখতে যাওয়া কি অপরাধ?”
তিনি আরও দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি ঢাকায় ছিলেনই না। পার্ট-টাইম জবের কাজে তখন তিনি সিলেটে অবস্থান করছিলেন।
পুলিশ ও রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান
বিথীর এসব আবেগঘন কথায় অবশ্য আইনি প্রক্রিয়া থেমে থাকেনি। ভাটারা থানার তদন্ত কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন আদালতে জোর দাবি জানান, গত ৫ আগস্টের সেই বর্বরোচিত ও সশস্ত্র হামলার ঘটনার সাথে বিথীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও মূল রহস্য উদঘাটনের স্বার্থেই তাকে এই মামলায় সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো প্রয়োজন। রাষ্ট্রপক্ষ আশঙ্কা প্রকাশ করে, আসামিকে জামিন দেওয়া হলে তদন্ত প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। শুনানি শেষে আদালত তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।
মামলার নেপথ্যের সেই ভয়াল দিন
মামলার নথী অনুযায়ী, গত বছরের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত দিনে ভাটারা থানাধীন প্রগতি সরণি এলাকায় একটি মিছিলে আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। সেখানে এলোপাতাড়ি গুলি ও ধারালো অস্ত্রের কোপে গুরুতর আহত হন সোহেলী তামান্না নামের এক নারী। সন্ত্রাসীদের নির্মম আঘাতে এবং পিঠে গুলিবিদ্ধ হয়ে তার বাম হাতের কার্যক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তীতে তিনি নিজেই বাড্ডা থানায় এই হত্যাচেষ্টা মামলাটি দায়ের করেন, যার রেশ ধরেই গ্রেপ্তার দেখানো হলো বিথীকে।
অপরাধের ছায়া নাকি নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস?
উল্লেখ্য, আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র অধিপতি সুব্রত বাইন দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর গত বছরের মে মাসে সেনাবাহিনীর অভিযানে কুষ্টিয়া থেকে গ্রেপ্তার হন। এরপর ডিসেম্বর মাসে কুমিল্লা কারাগারের সামনে থেকে আটক হন তার মেয়ে খাদিজা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, সুব্রত বাইনের অপরাধ চক্রের আর্থিক লেনদেন ও পলাতক সহযোগীদের সহায়তার পেছনে বিথীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। ইতোপূর্বে যুবদল নেতা আরিফ শিকদার হত্যা মামলাতেও তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল।
এখন জনমনে একটাই প্রশ্ন— শীর্ষ সন্ত্রাসীর মেয়ে বলেই কি বিথী আজ আইনি মারপ্যাঁচ ও নতুন নতুন মামলার জালে আটকা পড়ছেন, নাকি জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ের নেপথ্যে সত্যিই কলকাঠি নেড়েছিলেন তিনি? অপরাধের দায় কি সন্তানের ওপর বর্তায়, নাকি বিথীর কান্নার আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো অন্ধকার গল্প?
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা নিয়ে আপনাদের কী মনে হয়? বিচার কি সঠিক পথে এগোচ্ছে? আপনাদের মূল্যবান মতামত অবশ্যই কমেন্ট করে জানান! 👇
#মনোলোক #অপরাধ #আদালত #সুব্রতবাইন #খাদিজাইয়াসমিন #জুলাইআন্দোলন #বাংলাদেশনিউজ
Leave a Reply