
সৈয়দপুরের গোলাহাট ট্রেন হত্যাযজ্ঞ: ৫৫ বছরেও বিস্মৃত এক নৃশংস ইতিহাস
মনোলোক | ১৪ জুন ২০২৬,
দাঁড়িয়ে থাকা সেই ট্রেনটি দেখে বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে, কয়েক মুহূর্ত পর সেটি পরিণত হবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের সাক্ষীতে। নিরাপদে ভারতে পৌঁছে যাওয়ার আশায় ট্রেনে উঠেছিলেন সৈয়দপুরের বহু হিন্দু মাড়োয়ারি পরিবার। কিন্তু সেই যাত্রা আর গন্তব্যে পৌঁছায়নি—গোলাহাটে অপেক্ষা করছিল মৃত্যু।
১৯৭১ সালের জুন মাসে অবরুদ্ধ সৈয়দপুর শহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়, শহরে আটকে পড়া হিন্দু মাড়োয়ারিদের নিরাপদে ভারতের শিলিগুড়িতে পৌঁছে দেওয়া হবে। এজন্য সৈয়দপুর রেলস্টেশন থেকে চিলাহাটি সীমান্ত হয়ে একটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়।
এই ঘোষণায় বিশ্বাস করে বহু মাড়োয়ারি পরিবার তাদের বেঁচে থাকা সামান্য সম্বল নিয়ে ১৩ জুন সকালে সৈয়দপুর রেলস্টেশনে উপস্থিত হন। চারটি বগি বিশিষ্ট সেই বিশেষ ট্রেনে নারী, শিশু ও পুরুষদের আলাদা করে তোলা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ট্রেন ছাড়ার আগে প্রায় ২০ জন তরুণীকে তাদের পরিবারের সামনে থেকেই পাকিস্তানি সেনারা নামিয়ে নিয়ে যায়।
সকাল প্রায় ১০টার দিকে ট্রেনটি স্টেশন ছেড়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। কিন্তু শহরের বাইরে রেলওয়ে কারখানা পেরিয়ে গোলাহাট এলাকায় পৌঁছানোর পর হঠাৎ ট্রেনটি থেমে যায়। তখন ট্রেনের বাইরে অবস্থান করছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী বিহারিরা।
প্রত্যক্ষদর্শী তপন কুমার দাস ও গোবিন্দ চন্দ্র দাসের বর্ণনায় উঠে এসেছে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্ত। ট্রেনের কম্পার্টমেন্ট থেকে একে একে যাত্রীদের নামিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শিশু, নারী, বৃদ্ধ—কেউই সেই হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পাননি।
বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, গোলাহাট ট্রেন হত্যাযজ্ঞে প্রায় ৪৪৮ জন নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যার একটি অধ্যায়।
আজ সেই বিভীষিকাময় ঘটনার ৫৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশের অনেক মানুষ এখনও এই ইতিহাস সম্পর্কে অবগত নন। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরও গোলাহাট ট্রেন হত্যাযজ্ঞের শহীদদের স্মৃতি ও আত্মত্যাগকে যথাযথভাবে তুলে ধরা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
তথ্যসূত্র ও বর্ণনা: প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিচারণ
প্রতিবেদন সংকলন: জয়নাল আবেদীন হিরো, নীলফামারী জেলা।
Leave a Reply