
বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাকা, বাংলাদেশ আগামী ২০২৬ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বরাবরের মতোই পুরো বাংলাদেশ জুড়ে শুরু হয়েছে এক অভূতপূর্ব ফুটবল উন্মাদনা। বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের দল না থাকলেও, প্রিয় দলের প্রতি এদেশের মানুষের আবেগ ও ভালোবাসা সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। দেশের প্রতিটি কোণায় কোণায় চলছে প্রিয় দলের খোলস পরার প্রতিযোগিতা। তবে এই উৎসবমুখর আমেজের সমান্তরালে অসাবধানতার কারণে ঘটে যাওয়া ট্র্যাজেডি এবং সমর্থকদের অতি-উত্সাহ দেশের সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলছে।
মানিকগঞ্জে রঙের মেলা: রাস্তার দু’পাশে দুই পরাশক্তির দাপট
বিশ্বকাপের এই রঙে সবচেয়ে আকর্ষণীয় রূপ নিয়েছে মানিকগঞ্জের গ্রামীণ ও শহরের প্রধান সড়কগুলো। বিশেষ করে একটি সংযোগ সেতুর দুই পাশে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যকার নান্দনিক প্রতিযোগিতা এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল। সেতুর এক পাশে আকাশী-সাদা পতাকায় ছেয়ে গেছে, যেখানে উঁকি দিচ্ছে আর্জেন্টিনার আলবিসেলেস্তেদের আভিজাত্য। ঠিক তার বিপরীত পাশে শোভা পাচ্ছে ব্রাজিলের চিরচেনা সবুজ-হলুদ সেলেসাওদের দাপট।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই সাজসজ্জা কেবল নিজেদের দলের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি এক ধরনের সুস্থ সামাজিক প্রতিযোগিতা। নিজ নিজ উদ্যোগে বাঁশ ও কাপড়ের পতাকা তৈরি করে পুরো এলাকাকে উৎসবের নগরীতে পরিণত করেছে তরুণ সমাজ। তবে এই উৎসবের মাঝেও তারা যেন নিজ দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাকে সবার ওপরে স্থান দিতে ভুল না করেন, সেদিকেও নজর রাখা হয়েছে।
উৎসবের আড়ালে ট্র্যাজেডি: আমগাছে ঝরে গেল এক তাজা প্রাণ
ফুটবল প্রেম যখন অন্ধ আবেগে রূপ নেয়, তখন অসাবধানতা ডেকে আনে চরম বিপর্যয়। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই দেশের এক প্রান্ত থেকে এসেছে এক অত্যন্ত হৃদয়বিদারক খবর। প্রিয় দল ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ জার্সি গায়ে জড়িয়ে এক কিশোর মেতে উঠেছিল বিশ্বকাপ উদযাপনে। কাঁচা বাঁশের মাথায় প্রিয় দলের পতাকা বেঁধে সে চেয়েছিল বাড়ির পাশে বড় আমগাছটির মগডালে তা ওড়াতে, যাতে দূর-দূরান্ত থেকে সবার চোখে পড়ে তার প্রিয় দলের প্রতীক।
কিন্তু মুহূর্তের অসাবধানতা সব আনন্দকে বিষাদে পরিণত করল। আমগাছে ওঠার পর কাঁচা বাঁশটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশ দিয়ে যাওয়া পল্লী বিদ্যুতের উচ্চভোল্টেজ লাইনের ওপর গিয়ে পড়ে। কাঁচা বাঁশ বিদ্যুৎ পরিবাহী হওয়ায় মুহূর্তের মধ্যেই ওই ফুটবলপ্রেমী কিশোর বিদ্যুতায়িত হয়ে গাছের ডালেই প্রাণ হারায়। প্রিয় দলের জার্সি পরা অবস্থায় তার নিথর দেহ গাছের ডালে আটকে থাকার দৃশ্যটি পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে।
⚠️ বিশেষ সতর্কবার্তা ও সম্পাদকীয় আহ্বান:
বিশ্বকাপ ফুটবল আমাদের আনন্দ দিতে আসে, কারো পরিবারের আজীবনের কান্না হতে নয়। কাঁচা বাঁশ ও ভেজা কাপড়ের পতাকা ওড়ানোর সময় আশেপাশের বৈদ্যুতিক তার বা খুঁটি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। বহুতল ভবনের ছাদ বা ঝুঁকিপূর্ণ গাছে উঠে পতাকা টাঙানো থেকে বিরত থাকুন। আপনার একটু সচেতনতাই পারে একটি তাজা প্রাণ এবং একটি পরিবারকে অকাল ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে।
সুস্থ ফুটবল সংস্কৃতির প্রত্যাশা
বাংলাদেশি ফুটবল ভক্তদের এই বৈশ্বিক উন্মাদনা আন্তর্জাতিক মহলেও বহুবার প্রশংসিত হয়েছে। আর্জেন্টিনার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন থেকে শুরু করে ফিফা পর্যন্ত বাংলাদেশের এই আবেগকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে এই আবেগের আড়ালে যাতে কোনো প্রাণহানি বা সামাজিক দলাদলি বিশৃঙ্খলার রূপ না নেয়, সেদিকে স্থানীয় প্রশাসন ও অভিভাবকদের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
খেলাধুলা হোক বিনোদনের মাধ্যম, সম্প্রীতির বন্ধন। মানিকগঞ্জের মতো সুন্দর উৎসবমুখর পরিবেশ যেন সর্বত্র বজায় থাকে এবং অসাবধানতার কারণে আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়—এটাই হোক ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রাক্কালে আমাদের সকলের অঙ্গীকার।
Leave a Reply