
মনোলোক ডেস্ক: রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু রামিসা আক্তারকে (৮) ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় মাত্র ৫ কার্যদিবসে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নজিরবিহীন এক রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। ফৌজদারি কার্যবিধি (Criminal Procedure Code) অনুযায়ী, বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য উচ্চ আদালতের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা থাকায় মামলার যাবতীয় নথি লাল কাপড়ে মুড়িয়ে কড়া পুলিশ পাহারায় ইতিমধ্যেই হাইকোর্টে পাঠানো হয়েছে।
মামলার পটভূমি ও দ্রুততম রায়
গত ১৯ মে পল্লবীতে নিজ ফ্ল্যাটের রুমে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় ভুক্তভোগীর বাবার দায়ের করা মামলার পর পুলিশ দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করে এবং মাত্র ৫ দিনের মধ্যে চার্জশিট দাখিল করে। এরপর গত ৭ জুন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আসামিদের উপস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন, যেখানে মূল অপরাধী সোহেল রানা এবং তার সহযোগী স্ত্রী স্বপ্না আক্তার—উভয়কেই ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি সোহেলকে ৫ লাখ এবং স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে।
উচ্চ আদালতে পরবর্তী ধাপ
গত ৯ জুন ট্রাইব্যুনাল থেকে মোট ৭২ পৃষ্ঠার এই ডেথ রেফারেন্সের মূল নথি হাইকোর্টে এসে পৌঁছায়। মামলার চলমান ও নজিরবিহীন গতি দেখে আইনজ্ঞ ও সাধারণ মানুষ ধারণা করছেন, এই ফাঁসির রায় খুব দ্রুতই কার্যকর হতে পারে। তবে উচ্চ আদালতে আপিল ও শুনানির পর প্রধান আসামি সোহেলের স্ত্রী স্বপ্নার অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড থেকে আমৃত্যু বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিবর্তিত হতে পারে কি না, তা নিয়ে আইনি মহলে আলোচনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই প্রধান বিচারপতির নির্দেশনায় এই ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে এবং আগামী রবিবার থেকেই এর শুনানি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা
রামিসা হত্যা মামলার এই অভাবনীয় গতি দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক। তবে জনমনে এখনো কিছু প্রশ্ন ও আক্ষেপ রয়ে গেছে:
সোশ্যাল মিডিয়া যেন একমাত্র ভরসা না হয়: অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, অপরাধের বিচার পাওয়ার জন্য কেন প্রতিবার ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে? স্বয়ংক্রিয় আইনি প্রক্রিয়াই যেন সব ভুক্তভোগীর অধিকার নিশ্চিত করে।
রাজনৈতিক আমল যেন বিবেচ্য না হয়: অপরাধী কোন আমলে বা কোন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধ করেছে, তা বিচারিক ক্ষেত্রে একেবারেই বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত নয়। আইন সবার জন্য সমান হওয়া জরুরি।
অন্যান্য ঝুলে থাকা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি: রামিসা মামলার মতো দেশের সকল ধর্ষণ ও হত্যা মামলার নিষ্পত্তি যেন এমন দ্রুত গতিতে হয়—এটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রধান দাবি। উদাহরণস্বরূপ, বহুল আলোচিত ‘আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলা’-র ডেথ রেফারেন্সের নথি দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায় ঝুলে রয়েছে, যা দ্রুত নিরসন হওয়া প্রয়োজন।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এই দ্রুত ধারা দেশের প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে বজায় থাকবে, এটাই এখন ‘মনোলোক’ ও সাধারণ জনগণের একমাত্র প্রত্যাশা।
Leave a Reply