
মনোলোক ডেস্ক: হঠাৎ করেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মেসেঞ্জারে একটি সতর্কবার্তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে দাবি করা হচ্ছে, নির্দিষ্ট কিছু আন্তর্জাতিক নম্বর থেকে আসা মিসড কলে ব্যাক করলেই মাত্র ৩ সেকেন্ডে চুরি হয়ে যাচ্ছে ফোনের সব কন্টাক্ট নম্বর এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের গোপন তথ্য! এমনকি পুলিশের ‘সাইবার ক্রাইম বিভাগ’-এর নাম ব্যবহার করে ছড়ানো এই বার্তাটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হয়েছে তীব্র আতঙ্ক।
কিন্তু আসলেই কি শুধু একটা ফোন কলেই খালি হয়ে যেতে পারে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো রহস্য? চলুন জেনে নেওয়া যাক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতামত।
ভাইরাল হওয়া সেই বার্তাটিতে কী আছে?
ছড়িয়ে পড়া ওই বার্তায় বলা হয়েছে, বেলারুশ (+৩৭৫), লাতভিয়া (+৩৭১), সার্বিয়া (+৩৮১), তানজানিয়া (+২৫৫) সহ বিভিন্ন দেশের কোডযুক্ত কিছু নম্বর থেকে ফোন দিয়ে কেটে দেওয়া হচ্ছে। সেখানে ফিরে কল করলেই ফোনের সমস্ত তথ্য হ্যাক হয়ে যাবে। পাশাপাশি ফোনে #৯০ বা #০৯ চাপলে সিম কার্ডের নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে চলে যাবে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
আতঙ্ক নয়, জানুন আসল সত্য (Fact Check)
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেটে ছড়ানো এই বার্তার সিংহভাগই ভুল এবং অতিরঞ্জিত।
তথ্য চুরির দাবিটি ভুয়া: আধুনিক স্মার্টফোনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটা দুর্বল নয় যে, আপনি কাউকে শুধু একটি সাধারণ ভয়েস কল করলেই ৩ সেকেন্ডের মধ্যে আপনার ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট বা ব্যাংকের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে কপি হয়ে যাবে। হ্যাকিংয়ের জন্য সাধারণত কোনো ম্যালওয়্যার লিংক, ক্ষতিকর অ্যাপ ইনস্টল করা বা ওটিপি (OTP) শেয়ার করার প্রয়োজন হয়।
সিম ক্লোনিংয়ের দাবিটি পুরনো: #৯০ বা #০৯ চেপে সিম হ্যাক করার যে দাবিটি করা হচ্ছে, তা মূলত নব্বইয়ের দশকের ডিজিটাল ল্যান্ডফোন এক্সচেঞ্জের যুগের একটি পুরনো দুর্বলতা ছিল। বর্তমানের আধুনিক জিএসএম (GSM) সিম কার্ড বা স্মার্টফোনে এই কোড চেপে সিম হ্যাক বা ক্লোন করার কোনো সুযোগ নেই।
পুলিশের নাম ব্যবহার: বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট থেকে অফিশিয়ালি এই ধরনের কোনো বার্তা বা তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
তাহলে আসল বিপদটি কোথায়? (ওয়াঙ্গিরি স্ক্যাম)
বার্তাটি প্রযুক্তিগতভাবে ভুল হলেও, এই ধরনের আন্তর্জাতিক নম্বর থেকে আসা মিসড কলের পেছনে একটি বাস্তব প্রতারণা চক্র কাজ করে। আন্তর্জাতিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ওয়াঙ্গিরি স্ক্যাম’ (Wangiri Scam) বা ‘ওয়ান রিং স্ক্যাম’।
প্রতারণার কৌশল: দেশের বাইরে থেকে কিছু স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার সিস্টেমের মাধ্যমে আপনার ফোনে একটা রিং দিয়ে কেটে দেওয়া হবে। আপনি যখন কৌতুহলী হয়ে সেই নম্বরে ‘ব্যাক’ বা ফিরতি কল করবেন, তখন আপনার কলটি চলে যাবে একটি উচ্চ শুল্কের প্রিমিয়াম রেটের আন্তর্জাতিক নম্বরে। আপনি লাইনে যত সেকেন্ড থাকবেন, আপনার মোবাইল ব্যালেন্স থেকে প্রতি সেকেন্ডে বিপুল পরিমাণ টাকা কেটে নেওয়া হবে, যার একটি অংশ চলে যায় ওই প্রতারকদের পকেটে।
এখানে আপনার তথ্য হ্যাক হয় না, বরং আপনার অজান্তেই মোবাইল ব্যালেন্সের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
নিরাপদ থাকতে করণীয়
ডিজিটাল দুনিয়ায় আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। সাইবার বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের কল থেকে বাঁচতে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:
১. অপরিচিত আন্তর্জাতিক নম্বরে কল ব্যাক করবেন না: প্লাস (+৩৭১, +৩৭৫, +২৫৫ ইত্যাদি) চিহ্নযুক্ত কোনো অপরিচিত বিদেশি নম্বর থেকে মিসড কল এলে ভুলেও কৌতুহলবশত সেখানে ফিরতি কল করবেন না।
২. ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ারে সাবধান: ফোনে কেউ যদি নিজেকে ব্যাংক কর্মকর্তা বা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি দাবি করে আপনার ওটিপি (OTP), পাসওয়ার্ড বা পিন নম্বর চায়, তা কখনোই দেবেন না।
৩. গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকুন: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো বার্তা দেখলেই তা যাচাই না করে ঝড়ের গতিতে শেয়ার বা ফরোয়ার্ড করা থেকে বিরত থাকুন। আপনার একটি ভুল শেয়ার অন্য কারো মনের আতঙ্ক বাড়িয়ে দিতে পারে।
মনোলোক-এর শেষ কথা: অপরিচিত নম্বর থেকে আসা কল রিসিভ করা বা ব্যাক করার ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্ক থাকুন, তবে কোনো ভিত্তিহীন তথ্য বা গুজব দেখে আতঙ্কিত হবেন না। সুস্থ থাকুন, সচেতন থাকুন।
Leave a Reply