
আন্তর্জাতিক | মনোলোক : ICE কর্মকর্তাদের বডি ক্যামেরা প্রদান ও ফুটেজ প্রকাশ বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ দেশজুড়ে মাঠপর্যায়ের সব কর্মকর্তাকে বডি-ওর্ন ক্যামেরা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। তবে ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও জনসমক্ষে প্রকাশের ক্ষেত্রে সংস্থাটিকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ICE-এর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো অভিযানে কর্মকর্তার গুলিতে মৃত্যু বা গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটলে ভিডিও প্রকাশের আগে একটি কমিটি ফুটেজ পর্যালোচনা করবে। ভিডিও দ্রুত প্রকাশ করা সংস্থার ‘সর্বোত্তম স্বার্থে’ হবে বলে মনে হলে তা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ করা যেতে পারে।
তবে ICE পরিচালক যদি মনে করেন, ‘নির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক পরিস্থিতির’ কারণে ভিডিও প্রকাশ করা উচিত নয়, তাহলে তিনি তা আটকে দিতে বা অনির্দিষ্টকালের জন্য বিলম্বিত করতে পারবেন। নীতিমালায় ওই পরিস্থিতিগুলো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
বডি ক্যামেরা নিয়ে গবেষণা করা কানাডার ব্র্যান্ডন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ক্রিস্টোফার স্নাইডার বলেন, এই ধরনের নীতি পুলিশকে জনসম্মুখে নিজেদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার সুযোগ দিতে পারে। তার মতে, বডি ক্যামেরা শুধু জবাবদিহির মাধ্যম নয়, কখনো কখনো পুলিশের ভাবমূর্তি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
৩ কোটি ৯ লাখ ডলারে ক্যামেরা কেনা
ফেডারেল ব্যয়সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, জুলাইয়ে ICE অ্যারিজোনাভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Axon-এর কাছ থেকে প্রায় ৩০.৯ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে বডি ক্যামেরা কেনে। এর আগে কংগ্রেস ক্যামেরা কেনার জন্য ICE-কে ২০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছিল।
সম্প্রতি টেক্সাসের হিউস্টন ও মেইনে ICE কর্মকর্তাদের গুলিতে দুজন নিহত হওয়ার ঘটনায় নতুন করে বডি ক্যামেরার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ওই দুই ঘটনাতেই কর্মকর্তাদের শরীরে বডি ক্যামেরা ছিল না।
ICE জানিয়েছে, ইতোমধ্যে অর্ধেকের বেশি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার কাছে ক্যামেরা পৌঁছেছে এবং বাকিরাও সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ তা পাবেন। প্রতিটি গ্রেপ্তারকারী দলের অন্তত একজন কর্মকর্তার ক্যামেরা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে।

ICE কর্মকর্তাদের বডি ক্যামেরা প্রদান ও ফুটেজ প্রকাশ বিতর্ক
সব ভিডিও প্রকাশ হবে না
নীতিমালা অনুযায়ী, গ্রেপ্তার, তল্লাশি অভিযান এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কর্মকর্তাদের ক্যামেরা চালু রাখতে হবে। কিন্তু গুরুতর সংঘর্ষ বা গুলির ঘটনার ফুটেজ প্রকাশের সিদ্ধান্ত ICE-এর অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার ওপর নির্ভর করবে।
এমনকি ভিডিও প্রকাশ করা হলেও কর্মকর্তাদের মুখ, নাম ও ব্যাজ নম্বরসহ পরিচয় শনাক্ত করার মতো তথ্য মুছে দেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই নীতির কারণে যেসব ভিডিও ICE কর্মকর্তাদের পক্ষে যায়, সেগুলো দ্রুত প্রকাশ হতে পারে; কিন্তু বিতর্কিত বা নেতিবাচক ফুটেজ প্রকাশে বিলম্ব হতে পারে।
ICE-এর সহযোগী সংস্থা কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (CBP)-এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিনিয়াপলিসে আলেক্স প্রেট্টি নিহত হওয়ার ঘটনায় কর্মকর্তাদের বডি ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজ এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তদন্ত শেষ হলে ‘উপযুক্ত সময়ে’ তা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে CBP।
দীর্ঘদিনের বিলম্ব
ICE ২০২১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে বডি ক্যামেরা ব্যবহার শুরু করেছিল। ২০২৪ সালে প্রায় ১,৪০০ ক্যামেরা বিতরণ করা হলেও দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে এর ব্যবহার শুরু হয়নি।
সাবেক ICE চিফ অব স্টাফ জেসন হাউসার বলেন, সংস্থাটি অনেক আগেই কর্মকর্তাদের বডি ক্যামেরা দিতে পারত। তার মতে, সাম্প্রতিক কয়েকটি গুলির ঘটনার পর কংগ্রেসের চাপের মুখে ক্যামেরা সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের সীমান্তবিষয়ক কর্মকর্তা টম হোম্যান অবশ্য বডি ক্যামেরার পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, জনগণের উচিত ICE কর্মকর্তারা অভিযানের সময় কী দেখছেন ও শুনছেন তা জানা। তার দাবি, তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী বডি ক্যামেরার ফুটেজ অনেক সময় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বদলে তাদের নির্দোষ প্রমাণ করতেও সহায়তা করে।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন—যদি জনগণের অর্থে কেনা ক্যামেরার ফুটেজ প্রকাশের সিদ্ধান্তও শেষ পর্যন্ত সংস্থার নিজের ‘সুবিধা’র ওপর নির্ভর করে, তাহলে এসব ক্যামেরা প্রকৃতপক্ষে কতটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে?
Leave a Reply