হাফিজুর রহমান, মধুপুর (টাঙ্গাইল) | মনোলোক : স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় ও ‘আনারসের রাজধানী’ হিসেবে খ্যাত টাঙ্গাইলের মধুপুরে এখন আর চাষিদের মুখে হাসি নেই। উৎপাদন খরচের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, হাটে হাটে নানা ছলে চাঁদাবাজি (“লোকশান”), বেহাল সড়ক এবং বাজারজাতকরণের উচ্চ ব্যয়ের ভারে পিষ্ট হয়ে ঐতিহ্যবাহী আনারস চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মধুপুরের বিখ্যাত জলছত্র, গারো বাজার ও ২৫ মাইল এলাকায় প্রতিদিন ভোর থেকেই চাষিরা তাদের কষ্টার্জিত আনারস নিয়ে হাটে সমবেত হন। তবে বাজারে পৌঁছানোর আগেই তাদের গুনতে হয় বড় অঙ্কের অর্থ। সড়ক ও যাতায়াত ব্যবস্থার বেহাল দশার কারণে পরিবহন ভাড়া যেমন আকাশচুম্বী, তেমনি হাটে ঢোকার মুখেই দিতে হয় “লোকশান” নামক এক ধরনের তোলা বা চাঁদা।
ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, আনারস চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং শ্রমিকের মজুরি আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। দীর্ঘ ১৮ মাস নিবিড় পরিচর্যার পর একটি আনারস পরিপক্ব হয়ে বিক্রির উপযোগী হয়। কিন্তু বর্তমানে পাইকারি বাজারে আকারভেদে একটি আনারস ১৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। পরিবহন খরচ ও হাটের চাঁদা বাদ দেওয়ার পর কৃষকের হাতে যা অবশিষ্ট থাকে, তাতে মূল খরচই উঠছে না।
জলছত্র হাটে আসা এক চাষি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “আগে আনারস বিক্রি করেই আমাদের সংসার সুন্দরভাবে চলত। কিন্তু এখন যে খরচ, তাতে লাভ তো দূরের কথা, আসল টাকাই ঘরে ফেরে না। বাধ্য হয়ে এখন অনেকেই আনারসের জমি কমিয়ে কলা ও পেঁপে চাষ শুরু করেছেন।”
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর মধুপুরের আনারস ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি লাভ করে। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও এর ব্যাপক সুনাম ও চাহিদা রয়েছে। কিন্তু ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং প্রতি পদে নানামুখী চাঁদাবাজির কারণে শত বছরের এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্য এখন মারাত্মক হুমকির মুখে।
কৃষি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সময়ে চাষিদের উৎপাদন খরচ কমানো, হাটের অবৈধ চাঁদা বা “লোকশান” বন্ধ করা এবং যাতায়াত অবকাঠামোর উন্নয়ন না করা গেলে অচিরেই মধুপুর তার আনারসের গৌরবময় ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলবে।
অবিলম্বে সারের কৃত্রিম সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি রোধ, হাটে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন মধুপুরের ভুক্তভোগী আনারস চাষিরা।
Leave a Reply