
বিশেষ প্রতিনিধি, মনোলোক : তেহরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সর্বশেষ আগ্রাসী সামরিক যুদ্ধ চলাকালীন চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই ইরান আরও আধুনিক, নিখুঁত এবং উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। আজ (রোববার) ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, সাম্প্রতিক ‘রমজান যুদ্ধ’-এর শেষভাগে ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণ নতুন প্রজন্মের ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রে সফলভাবে ব্যবহার করেছে, যার গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কাজ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই সম্পন্ন করা হয়েছিল।
রণক্ষেত্রেই নতুন প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ
জেনারেল আকরামিনিয়া ইরানের সামরিক সক্ষমতার স্বনির্ভরতা উল্লেখ করে বলেন:
“আমরা শুধু প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধই করিনি, বরং যুদ্ধ চলাকালীনই এই নতুন ড্রোনগুলোকে সরাসরি সামরিক কার্যক্রমে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। এর অর্থ হলো—একদিকে আমাদের বাহিনী শত্রুর মোকাবেলা করছিল, অন্যদিকে আমাদের প্রকৌশলীরা প্রযুক্তির আধুনিকায়নে ব্যস্ত ছিলেন।”
তিনি আরও জানান যে, দেশের নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই যুদ্ধে যে সমস্ত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, সেগুলোকে আগের চেয়ে অনেক উচ্চমানের প্রযুক্তিতে রূপান্তর ও উন্নত করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, যুদ্ধক্ষেত্রের জরুরি ব্যবহারের পাশাপাশি ইরানের গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ এক মুহূর্তের জন্যও থমকে যায়নি।
‘আরাশ-২’কে ছাড়িয়ে নতুন ড্রোন
সাম্প্রতিক সময়ে অস্ত্র উৎপাদনে ইরানের অগ্রগতির বিশদ বিবরণ দিয়ে সেনাবাহিনীর এই মুখপাত্র বলেন,
প্রযুক্তির উৎকর্ষ: যুদ্ধের শেষ দিকে রণক্ষেত্রে যে ড্রোনগুলোর উন্মোচন করা হয়েছে, সেগুলো ইরানের পূর্ববর্তী বিখ্যাত আত্মঘাতী ড্রোন ‘আরাশ-২’-এর তুলনায় অনেক বেশি উন্নত, দূরপাল্লার এবং নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম।
জনগণের সামনে প্রকাশ: খুব শীঘ্রই এই নতুন ড্রোনগুলোর সুনির্দিষ্ট সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত দিকগুলো প্রিয় ইরানি জাতির সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হবে।
দ্বিমুখী কৌশল: নিরাপদ ও শক্তিশালী ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে ইরান বর্তমানে দুটি কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে—প্রথমত, দেশীয়ভাবে অত্যাধুনিক অস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দ্বিতীয়ত, বন্ধু রাষ্ট্রগুলো থেকে আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ।
পটভূমি: ৪০ দিনের প্রতিরোধ ও ঐতিহাসিক সমঝোতা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে তাদের দ্বিতীয় দফার সামরিক আগ্রাসন শুরু করে। ওই হামলায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী এবং দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার শহীদ হন।
এই চরম আঘাতের জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী দীর্ঘ ৪০ দিন ধরে শত্রুপক্ষের ওপর ১০০ দফা পাল্টা হামলা চালায়। অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী এই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয় এবং তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
অবশেষে দীর্ঘ সামরিক উত্তেজনার পর, গত ১৫ জুন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা ঘোষিত হয়। এই সমঝোতার আওতায় লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ চলাকালীন ইরানের এই নতুন প্রযুক্তির প্রদর্শনই ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে সমঝোতার টেবিলে বসতে বাধ্য করেছে।
Leave a Reply